অর্পণ দাস: ২০০৫ বিশ্বকাপের ফাইনাল। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। স্থান সেঞ্চুরিয়ন। সেই দেশেরই জোহানেসবার্গে তার বছর দুয়েক আগে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, শচীন তেণ্ডুলকরদের। সেই যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে এক নয়া ইতিহাসের রাস্তা খোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল ভারতের মহিলা ক্রিকেটারদের হাত ধরে। না, কোনও বদলা নয়। নিজেদের ইতিহাস তৈরি করতে হবে নিজেদের মতো করেই। কিন্তু সে যাত্রায় মিতালি রাজ, ঝুলন গোস্বামীরা পরাস্ত হয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কাছে।
সেই দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন রুমেলি ধর। চোখের সামনে স্বপ্নভঙ্গের সাক্ষী ছিলেন বাঙালি অলরাউন্ডার। মাঝে ২০১৭-তেও বিশ্বকাপ হাতছাড়া হয়েছে। সেই দলে অবশ্য রুমেলি ছিলেন না। এবার ২০২৫-এ ফের সোনালি মায়ার হাতছানি। যে ট্রফি অধরা থেকে গিয়েছে বারবার, সেই খরা কি কাটবে জেমাইমা রদ্রিগেজ, স্মৃতি মন্ধানাদের হাত ধরে? নবি মুম্বইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ফাইনালের আগে ‘সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল’-এর কাছে স্মৃতি থেকে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরলেন রুমেলি।

তাঁর সাফ বক্তব্য, যদি রবিবার হরমনপ্রীত কউরের হাতে ট্রফি ওঠে, তাহলে তা শুধু এই দলটা জিতবে না। জিতবে অতীত-বর্তমান মিলিয়ে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট। তিনি বলছেন, “২০০৫-এ বিশ্বকাপ ফাইনালে আমরা হেরেছিলাম। আমি সেই দলের অন্যতম সদস্য ছিলাম। তারপর ২০১৭-তে একটা সুযোগ আসে। এবার দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ। হরমনপ্রীতরা জিতলে শুধু বর্তমান সক্রিয় প্লেয়ার নয়, সবাই জিতবে। যেদিন থেকে ভারতে মহিলাদের ক্রিকেট শুরু হয়েছে, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত, সব মহিলা ক্রিকেটারই জিতবে। গোটা দেশের মহিলা ক্রিকেট জিতবে, সবার স্বপ্নপূরণ হবে।”

২০০৩ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অভিষেক হওয়ার পর রুমেলি তিন ফরম্যাট মিলিয়ে খেলেছিলেন ১০০টি ম্যাচ। নিয়েছেন ৮৪টি উইকেট। ব্যাট হাতে করেছেন ১৩২৮ রান। কিন্তু তাঁর কেরিয়ারে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চোট-আঘাতের সমস্যা। আবার ৬ বছর পর ২০১৮ সালে জাতীয় দলে কামব্যাক করেছিলেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল ৩৪ বছর। ভারতীয় ক্রিকেটে তিনি ‘কামব্যাক ক্যুইন’ নামেই পরিচিত। এবারের ভারতীয় দলটাও তো ঠিক তাই। টানা তিনম্যাচ হেরে শেষ চারের সম্ভাবনা থেকে অনেকটাই দূরে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে সেমিফাইনাল ও সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট।

কীভাবে এই কামব্যাক সম্ভব হল? রুমেলি জানালেন, “লড়াকু মানসিকতা। তার সঙ্গে দরকার নিজের উপর বিশ্বাস। আমাদের আরও আগে যেতে হবে, উন্নতি করতে হবে, এই মানসিকতাটাই দরকার। আমরা তো দেখেছি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, এমনকী দক্ষিণ আফ্রিকাকেও কামব্যাক করতে। তিনটি ম্যাচ হেরে যখন আমরা কামব্যাক করছি, তখন ধরে নিতে হবে আমাদের আত্মবিশ্বাস ও লড়াকু মানসিকতা তুঙ্গে।”

সেটা ভালো মতোই প্রমাণ করেছেন জেমাইমারা। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ৩৩৮ রান তাড়া করতে নেমে ভারত জেতে ৫ উইকেটে। সেঞ্চুরি করে অপরাজিত থাকেন জেমাইমা। তিনি এখন ‘বন্দিত নায়িকা’। যে বছর জেমাইমার অভিষেক, সে বছরই ভারতের জার্সিতে কামব্যাক হয় রুমেলির। আর শুধু জেমাইমা কেন, রিচা-শ্রী চরণী-আমনজ্যোতের মতো তরুণ প্রতিভা রয়েছে। যাঁরা যে কোনও মুহূর্তে ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারেন। কোথায় স্পেশাল এই ‘জেনারেশন গোল্ড’? রুমেলি বলছেন, “এখন আমাদের ফিজিও, ট্রেনাররা যেভাবে প্রতি মুহূর্তে সাহায্য করেন, সেগুলো খুবই কার্যকরী। কী খেতে হবে, কী খাওয়া যাবে না কিংবা কীভাবে ওয়ার্ক আউট করতে হবে, এইগুলো অনেক কিছুর পার্থক্য গড়ে দেয়। তাছাড়া নিজেদের শৃঙ্খলা তো আছেই।”

২০০৫-এ হার মানতে হয়েছিল। ২০১৭-র লর্ডসে ঝুলনদের হার আজও ফিরে ফিরে আসে দেশের ক্রিকেট ভক্তদের দুঃস্বপ্নে। ২০২৫-এ কী করা যাবে না? কোন মন্ত্রে চ্যাম্পিয়ন তকমা জুড়বে ভারতের মুকুটে? রুমেলি বলেন, “সেভাবে মন্ত্র দেওয়ার কিছু নেই। সেমিফাইনালে আমরা যেভাবে খেলেছি, কামব্যাক করেছি, একটা মুহূর্তের জন্যও ম্যাচ ছাড়িনি। ফাইনালটাও সেই মানসিকতা নিয়েই খেলা উচিত। আমার তরফ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।”

১৯৮৩ সালে কপিল দেব, ২০১১ সালে মহেন্দ্র সিং ধোনি। পুরুষদের ক্রিকেটে দু’বার ওয়ানডে বিশ্বকাপ এসেছে ভারতের ঝুলিতে। অনেকেই মনে করছেন, ২০২৫-এ হরমনপ্রীতরা জিতলে একটা বৃত্ত পূরণ হবে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি এই তুলনার কোনও প্রয়োজনই নেই। পুরুষরা নিজেদের মতো করে দেশকে গর্বিত করেছে। বিশ্বকাপ জিতুক বা না জিতুক, তাতে মহিলাদের গর্ব ক্ষুণ্ণ হবে না। রুমেলিও বললেন, “মহিলা ক্রিকেটাররা সবসময় নিজেদের সেরাটা দিয়ে এসেছে। আগে মহিলাদের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কম ছিল, এখন মহিলা ক্রিকেটারদের সবাই চেনে। আর কাল যদি আমরা জিতি, তাহলে আরও ভালোভাবে সবাই মহিলা ক্রিকেটারদের চিনবে। তাই পুরুষ ক্রিকেটার ও মহিলা ক্রিকেটার, আমি এভাবে পার্থক্য করতে চাই না। আমি এই পার্থক্যে বিশ্বাস করি না।” কোনও তুলনা নয়। ইতিহাস তৈরি হবে নিজের ছন্দে। জেমাইমা-হরমনপ্রীতদের ব্যাটে, দীপ্তি-শ্রী চরণীদের বলে। আর তো মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। আশায় বুক বাঁধছে দেশবাসী।