অর্ণব আইচ, পারাদ্বীপ: কালো হয়ে গিয়েছে সমুদ্রের নীল জল। জাহাজ থেকে তেল চুঁইয়ে পড়ছে নোনা জলে। সমুদ্রের প্রাণীরা বিপন্ন।
এই বার্তা আসামাত্রই চারিদিকে পড়ে গেল হুলস্থুল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নীল সাগরের জল কেটে সমুদ্রতট থেকে অন্তত কুড়ি কিলোমিটার দূরে এগিয়ে চলল ভরত, অমোঘ, অদম্য, অমৃতকর, কমলাদেবী আর সি৪৬। নজরদারিতে রইল বিজয়। আর বিষাক্ত তেল কতটা ছড়িয়ে পড়েছে, আকাশপথে সেদিকে নজর রাখতে উড়ে বেড়াল ডর্নিয়ের বিমান।
অমোঘ, অদম্য, অমৃতকর, বিজয়রা হচ্ছে কোস্ট গার্ড তথা উপকূল রক্ষী বাহিনীর জাহাজ। সত্যি কোনও জাহাজ থেকে কোনওভাবে তেল সমুদ্রে মিশে গেলে তার ফল কতটা মারাত্মক হতে পারে ও কত তাড়াতাড়ি সমুদ্র দূষণমুক্ত করে জলজ প্রাণীদের বাঁচানো সম্ভব, বুধবার ওড়িশার পারাদ্বীপে তারই মহড়া চালাল উপকূলরক্ষী বাহিনী। এই মহড়ার নাম ‘রিজিওনাল লেভেল পলিউশন রেসপন্স এক্সারসাইজ’। এই ব্যাপারে পারাদ্বীপে বসেই উত্তর-পূর্ব ভারতের আইজি (কোস্ট গার্ড) ইকবাল সিং চৌহান জানান, তেল থেকে দূষণের জন্য সমুদ্র ও তটের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জলে মেশা তেল সমুদ্রতটে পৌঁছনোর আগে কীভাবে তা প্রতিহত করা যায় ও যদি কোনওভাবে পৌঁছেও যায়, কীভাবে সমুদ্র তটকে বাঁচানো সম্ভব, তা নিয়েই স্থানীয় প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে এই মহড়া। হলদিয়ায় উপকূলরক্ষী বাহিনীর নিজস্ব পলিউশন সেল রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সেখানে যৌথভাবে মাঝেমধ্যেই মহড়া চলে। বাংলার সমুদ্রতটেও রাজ্যের সঙ্গে যৌথভাবে দূষণ দমনের মহড়া চালাতে ইচ্ছুক উপকূলরক্ষী বাহিনী। এ ছাড়াও প্রশ্নের উত্তরে আইজি (কোস্ট গার্ড) জানান, সম্প্রতি সমুদ্রে একটি দুর্ঘটনায় জাহাজের ধাক্কায় যে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে, সেই ব্যাপারে তদন্ত চলছে। বাংলাদেশি জাহাজ ও মাছ ধরা ট্রলারের উপর চলছে বিশেষ নজরদারি। সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েকটি অবৈধ বাংলাদেশি ট্রলার ধরাও পড়েছে।
এদিন উপকূলরক্ষী বাহিনীর এক আধিকারিক জানান, সাধারণত কোনও জাহাজ দুর্ঘটনার মুখে পড়লে অথবা পুরনো জাহাজের অংশ ক্ষয়ে গেলে তা থেকে তেল পড়া সম্ভব। একবার তেল পড়তে শুরু করলে, তা সমুদ্রের ঢেউ ও হাওয়ায় অনেকটা দূর ছড়িয়ে পড়ে।
জায়গাবিশেষে সমুদ্রের জলের উপর ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত তেলের স্তর পড়ে ভাসতে থাকে। এদিনের মহড়ায় ‘মাল বহনকারী জাহাজ’ থেকে তেল না পড়লেও বিষাক্ত নয়, এমন রং জলে ছড়ানো হয়। এবার একাধিক দফায় চলে অভিযান। প্রথম দফায় তেল যাতে না ছড়ায়, তার জন্য উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজগুলি সহকারী জলযানের সাহায্যে ভাসমান ব্যারিয়ার দিয়ে তেল আটকানোর চেষ্টা করে। পরের দফায় সেই আটকানো তেল ‘স্কিমার’-এর সাহায্যে তুলে ফেলার চেষ্টা হয়। স্পঞ্জের মতো বস্তু দিয়ে সেগুলি শুষে নিয়ে রাখা হয় বিশেষভাবে তৈরি ড্রামে। সেগুলি সমুদ্র তটে নিয়ে আসার পর পরিশোধন করার চেষ্টা হয়। সেই পরিশোধিত তেল ফের ব্যবহার করা সম্ভব।
এর পরও দূরে ঢেউয়ের সঙ্গে ভেসে যাওয়া তেল যাতে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর না হয়ে উঠতে পারে, তার জন্য ব্যবহার করা হয় ‘অয়েল স্পিল ডিস্পারসান্ট কেমিক্যাল’। এদিনও মহড়ায় জাহাজ করে নকল তেল ছড়িয়ে দেয় উপকূলরক্ষী বাহিনী। সাধারণভাবে এই রাসায়নিক ভাসমান তেল সমুদ্রের তলদেশে জমা করে দেয়। আর কতটা তেল ভেসে গিয়েছে সেদিকে নজর রাখে উপকূলরক্ষী বাহিনীর বিমান ও হেলিকপ্টার। জলজ প্রাণী ও সম্পদ যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে বিশেষ নজর রাখা হয় বলে জানিয়েছে উপকূলরক্ষী বাহিনী।