Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৪ জুন ২০২৬
Christmas

বাঙালির বড়দিন ‘হিন্দু-বিরোধী’ নয়, পালন করব না কেন?

অন্যের উৎসবকে ‘না’ বলার নেতিবাদ আর যাই হোক বাঙালির হিন্দু ধর্ম নয়।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫, ১৮:২৫

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫, ১৮:২৫

options
link
বাঙালির বড়দিন ‘হিন্দু-বিরোধী’ নয়, পালন করব না কেন? zoom

‘সত্যিকারের’ হিন্দু হলে ক্রিসমাস বয়কট করতে হবে? বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণ কোনও ধর্মেই ভালো নয়। কিন্তু তার মানে কি এই যে, বড়দিন পালন করা মানে মিশনারিদের শোষণ মেনে নেওয়া? ‌বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সুরেন্দ্র গুপ্ত বোধহয় ধর্মান্তরকরণ আর বড়দিনের উৎসব– দু’টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলছেন। বড়দিনে প্রভু যিশুর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং বাঙালির বড়দিন উৎসব পালন কখনওই হিন্দু-বিরোধী অবস্থান নয়। ২৫ ডিসেম্বর উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ঘোষণা করেছে, আপনি যদি ‘সত্যিকারের’ হিন্দু হন,‌ তবে এবার ক্রিসমাস (Christmas) ‘বয়কট’ করুন। বড়দিন পালন খ্রিস্টীয় উৎসব। এই উৎসবে যোগ দেবেন কেন? কলকাতা এসে আরএসএসের সরসংঘচালক মোহন ভাগবত হিন্দু সমাজের উদারতা ও সমাজসেবার কথা তুলে ধরতে চাইলেন। কিন্তু সেই আরএসএসেরই আর-এক সঙ্গী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দিল্লির বিশিষ্ট নেতা সুরেন্দ্র গুপ্ত, যিনি এ সংগঠনের ‘ইন্দ্রপ্রস্থ প্রদেশ‌ মন্ত্রী’, বলেছেন, হিন্দুদের প্রয়োজন আত্মসংযম ও আত্মমর্যাদা। দেশের নানা প্রান্তে বহু সময় ধরে সংগঠিতভাবে বহু চার্চ ধর্মান্তরকরণের কাজ করছে। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন। হিন্দুরা যদি ‘ক্রিসমাস’-এর উৎসবে যোগ দেয়, তবে ওদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে মেনে নেওয়া হবে।

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'নজরে নবান্ন' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

‌এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয় নয়, ধর্মান্তরকরণের প্রতিবাদ। বড়দিন পালন করা মানে মিশনারিদের শোষণ মেনে নেওয়া।‌ হিন্দুদের সহিষ্ণুতার সুযোগ ওরা নিচ্ছে।‌
বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এই বক্তব্য বাংলা সংবাদমাধ্যমে সেভাবে অগ্রাধিকার এখনও পায়নি। তবে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় তভলিন সিং এই ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ‘ওয়্যার’ ডিজিটাল মাধ্যমে সুরেন্দ্র গুপ্ত তঁার বক্তব্যকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন আরও জোরালোভাবে।

এ ঘটনার পরে প্রশ্ন জাগে– এই কি তবে আমাদের নতুন ভারত? বড়দিনে প্রভু যিশুর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন এবং বাঙালির বড়দিন উৎসব পালন মানে কি তবে তা হিন্দুবিরোধী অবস্থান? অলিভার ক্রমওয়েলের শাসনে পিউরিটানদের কোপদৃষ্টিতে ইংল্যান্ডে বড়দিন পালন করা ঘুচে যায়। সবাই মিলে ভাল থাকার উৎসব কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। চার্লস ডিকেন্স তঁার ‘দ্য ক্রিসমাস ক্যারল’ নামের ছোট উপন্যাসে আবার সেই ভালবাসার উৎসব পালনকে ফিরিয়ে আনেন। বিজেপি যে-কারণে বাঙালির হিন্দু ধর্মের বিশেষ স্বরূপটি ধরতে পারেনি, সে-কারণেই এই হিন্দুবাদ বড়দিনের সঙ্গে বাঙালি হিন্দু সমাজের সংশ্লেষণের সংস্কৃতিটাও ধরতে পারছে না।
তত্ত্বকথায় না গিয়ে অতীতের কিছু ঘটনার কথা স্মরণ করছি। আমরা জানি, স্বামী বিবেকানন্দের জীবনে নিত্যসঙ্গী ছিল দু’টি বই। একটি ‘গীতা’, দ্বিতীয়টি ‘বাইবেল’। সঙ্গে টমাস কেম্পিসের ‘ইমিটেশন অফ ক্রাইস্ট’ বইটি। স্বামী বিবেকানন্দ নিজে যিশুকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করতেন। তিনি একদা বলেছিলেন, যিশুর সময়ে আমি জীবিত থাকলে চোখের জলে নয়, রক্ত দিয়ে পা দু’খানি ধুয়ে দিতাম (‘বিবেকানন্দ ও সমকালীন ভারতবর্ষ’, সপ্তম খণ্ড, শঙ্করীপ্রসাদ বসু, পৃ-১৫৮- ১৯৯৬)।

আসলে, বাংলার সংস্কৃতিতে চিরকাল এই ধর্ম সমন্বয়ের ভাবনা ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তারা কালীঘাটে প্রতিনিধি পাঠিয়ে পুজো দিয়েছেন। আবার সাহেবদের উৎসাহে কলকাতায় বড়দিন পালন শুরু হলেও ১৯ শতকে এই উৎসব সর্বজনীন রূপ নেয়। রাজা রামমোহন রায় “‘Final Appeal to The Christian Public, in Defense of the ‘Precepts of Jesus’” বইটিতে যিশুর বাণীর সংস্কৃত অনুবাদ করেন।

দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্ম সমাজে বরং হিন্দুরা আসতে থাকে।‌ তারা মূর্তিপুজোর বদলে যে উপাসনা শুরু করে, সেখানে যিশুর বন্দনাও ছিল। বহু পণ্ডিত বলে– এই ব্রাহ্ম সমাজ কিছু উগ্র মিশনারিদের রুখতে সাহায্য করে। ধর্মান্তরকরণ আর বড়দিনের উৎসব– দু’টি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা অনুচিত। বলপূর্বক ধর্মান্তরকরণ কোনও ধর্মেই ভাল নয়। ভুলি কী করে স্বামীজি তঁার শিকাগো বক্তৃতায় (১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৩) বলেছিলেন, ‘Do I wish that the Christian would become Hindu? God Forbid.’

বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিতে খ্রিস্টনি প্রভাবের গবেষক জনসন সন্দীপের লেখা ‘বিবেকানন্দ সাহিত্যে যীশুখৃষ্ট’ বইয়েও লেখক দেখিয়েছেন, স্বামীজির জীবনে রামকৃষ্ণ মিশন ও সংঘ প্রতিষ্ঠার সময়ও যিশুর প্রভাব কতখানি ছিল। ভগিনী নিবেদিতা থেকে ভগিনী ক্রিশ্চিন, জে. জে. গুডউইন, মিসেস ওলিবুল-সহ আরও বহু খ্রিস্টান ভক্তর প্রভাবের কথাও জনসন সন্দীপ দেখিয়েছেন।

স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, খ্রিস্ট ধর্ম ও হিন্দু ধর্মের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন– তফাত যাই থাকুক না কেন, আসলে দুই ধর্মেরই মূল সুর হল অদ্বৈত বেদান্তের ভাব। আবার স্বামীজির আচার্যদেব ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের যিশুর প্রতি শ্রদ্ধার কথা সুবিদিত। ভক্ত যদু মল্লিকের বাড়িতে মা মেরি আর তঁার পুত্র যিশু খ্রিস্টকে দেখে ঠাকুরের মনে হয় যে, মা যশোদা আর তঁার বালগোপাল। ঠাকুর সমাধিস্থ হন‌। এখনও দক্ষিণেশ্বরে গেলে দেখা যায়, ঠাকুরের শয়ন কক্ষে একটি চিত্র আছে। সেখানে আছে পিটার জলে ডুবে যাচ্ছেন আর যিশু তার একটি হাত ধরে তঁাকে টেনে তুলছেন। কথামৃতকার মাস্টারমশাই বলেন, এটি ছিল ঠাকুরের খুব প্রিয় ছবি। অন্যান্য ঠাকুর-দেবতার মধ্যে এই ছবিটি বিরাজ করত।

তাই বড়দিনের উৎসবের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদ বা উপনিবেশবাদ নেই, অতীতের কতিপয় যাজকের ধর্মান্তরকরণের বলপূর্বক প্রচেষ্টার সঙ্গে এই সামাজিক উৎসবের কোনও সম্পর্ক নেই। আমি নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র। সেই কোন আবাসিক বাল্যজীবন থেকে দেখেছি আমাদের স্কুলে-কলেজে, বেলুড় মঠ ও তার প্রায় ৩০০ ছোট-বড় শাখায় বড়দিন পালন হয়। সেদিন আশ্রমে কেক প্রসাদ দেওয়া হয় ঠাকুরকে।

এখনও এ প্রথা বহাল। স্কুল শুরুর সময় নানা অবতারের বাণী পাঠের রেওয়াজ ছিল বিদ্যালয়ে। সেখানে ঠাকুর, মা, স্বামীজির পাশাপাশি প্রভু যিশুর বাণীও পড়তে হত। আমি গর্বিত বাঙালি। আমার ও আমাদের হিন্দু ধর্মে সংঘাত নয়, সমন্বয় আছে। পরমত সহিষ্ণুতার সংস্কৃতিই আমাদের বাঙালিয়ানায় মিশে আছে। তাই দুঃখিত, ক্রিসমাস উৎসবকে বয়কট, অন্যের উৎসবকে ‘না’ বলার নেতিবাদ আর যাই হোক বাঙালির হিন্দু ধর্ম নয়।
(মতামত নিজস্ব)

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'নজরে নবান্ন' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.