ক্রাতোভা : ইরানের তেইশ জনের স্কোয়াড- ৪৮.৩ মিলিয়ন ইউরো। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো- ১০০ মিলিয়ন ইউরো!
রাশিয়া বিশ্বকাপে ইরানের বিরুদ্ধে শেষ গ্রুপ ম্যাচের আগে পতুর্গালের এক নামী দৈনিকে দেখা গেল, কার্লোস কুইরোজের টিমের সঙ্গে সিআর সেভেনের তুল্যমূল্য একটা বিচার করেছে। ফুটবল মার্কেটে দুইয়ের কাঞ্চনমূল্যের বিচার! ক্লাব ফুটবলে গোটা ইরান টিমের সম্মিলত দাম যোগটোগ করে তারা পেয়েছে ওই উপরের অঙ্ক। ৪৮.৩ মিলিয়ন ইউরো। হালফিলে ইরানের সবচেয়ে নামী প্লেয়ার আলিরেজা জাহানবকসের অর্থমূল্য ধরে। আর রোনাল্ডো? দেখা যাচ্ছে, অর্থের বিচারে গোটা ইরান টিমের তিনি দ্বিগুণ!
একাই একশো মিলিয়ন ইউরো।
তথ্য হিসেবে মজাদার শুধু নয়, বেশ আকর্ষণীয়ও বটে। কিন্তু তার পিছন-পিছন যে কর্কশ প্রশ্নটা ছুটে আসে, তা শুনতে সিআর সমর্থকদের বিশেষ ভাল লাগবে না। পর্তুগাল যতই সিআর ইঞ্জিনে নির্ভর করে বিশ্বকাপ জুড়ে ছুটোছুটি করে বেড়াক, যতই স্পেনের ঔদ্ধত্য একা কেড়ে নিয়ে যান রোনাল্ডো, পর্তুগালের দ্বিতীয় রাউন্ড যাত্রা নিশ্চিত নয় তো বটেই। বরং গ্রুপের শেষ ম্যাচে তারা এমন এক এশীয় শক্তির সামনে, যারা ব্রাজিল বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার কালঘাম বার করে ছেড়েছিল। আর রাশিয়ায় ঠিক একই কাজ করেছে দিয়েগো কোস্তা-আন্দ্রে ইনিয়েস্তার স্পেনের বিরুদ্ধে। মাত্র ক’দিন আগে।
তা হলে?
[ ফুটবলারদের দাবি মেনে সরানো হচ্ছে সাম্পাওলিকে, আর্জেন্টিনার নতুন কোচ নিয়ে জল্পনা ]
তা হলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো পারবেন তো নিজের ভেতর থেকে ক্ষুধার্ত রোনাল্ডোকে আরও একবার বার করতে? পারবেন তো একশো মিলিয়ন ইউরোর আরও একটা পারফরম্যান্স দিতে যা কি না তাঁর ইউরোজয়ী দেশকে তুলে দেবে বিশ্বকাপের পরের পর্বে? সারানস্কে ইরান ম্যাচ খেলতে উড়ে যাওয়ার আগে ক্রাতোভোর বেসক্যাম্পে রবিবার সকালে হালকা ট্রেনিং করেন রোনাল্ডো। এবং রিয়াল মাদ্রিদ মহাতারকাকে যথেষ্ট ফুরফুরেও দেখিয়েছে। সতীর্থ বানার্ড সিলভার সঙ্গে ক্রমাগত ঠাট্টা-ইয়ার্কি চালাচ্ছিলেন। রোনাল্ডোকে ‘হেড-টেনিস’-ও খেলতে দেখা যায়। স্বাভাবিক। আর যা-ই হোক, রোনাল্ডোর উপর শেষ ম্যাচে ‘জিততেই হবে’-র মহাচাপ তো নেই। ড্র করলেই দ্বিতীয় রাউন্ড। চিন্তা শুধু দু’টো। ইরানিদের অদম্য ইচ্ছেশক্তি। এবং তাদের কোচ স্বয়ং। প্রাক্তন পর্তুগাল কোচ কার্লোস কুইরোজ। কুইরোজ এ দিন খুব দুঃখ করেছেন নিজের ভাগ্য নিয়ে। ইরান ট্রেনিংয়ের সময় স্বদেশীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় বলে ফেলেছেন, আট বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে তিনি যখন পর্তুগাল কোচ ছিলেন, এমন আগুনে রোনাল্ডোকে পাননি। যে সুখ উপভোগ করছেন পর্তুগাল কোচের চেয়ারে তাঁর উত্তরসুরি ফের্নান্দো স্যান্টোস। “আমার ভাগ্যটাই খারাপ। আমি যে রোনাল্ডোকে পেয়েছিলাম, আর আমার টিমের বিরুদ্ধে যে রোনাল্ডো নামবে, দু’জন এক নয়,” বলে ফেলেছেন কুইরোজ।
[ বিশ্বকাপের নক-আউটে কারা কারা, কোন অঙ্কে আটকে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ভাগ্য? ]
ঠিকই। কুইরোজ-জমানার রোনাল্ডো তখনও ইউরো জেতেননি। আর্ন্তজাতিক ফুটবলে মহাসাফল্যের রক্ত-স্বাদ কাকে বলে, জানতেন না। স্যান্টোস-জমানার সিআর যা জানেন। ফুটবল সার্কিটে বলাবলি চলছে, রাশিয়া বিশ্বকাপের জন্য বহু দিন ধরে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন রোনাল্ডো। ক্লাব ফুটবলে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে খেলেছন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে পর্যন্ত পার্সেন্টেজ ফুটবল খেলে ছেড়ে দিয়েছেন। ক্লাবের আগে রেখেছেন দেশ। ক্লাব ফুটবলে নিজের অসীম ফুটবল-শক্তি খরচ না করে রেখে দিয়েছেন স্রেফ বিশ্বকাপের জন্য। জীবনের শেষ বিশ্বকাপের জন্য। আর রুশ বিশ্বকাপের খুনে সিআর, প্রকৃত অধিনায়ক সিআর যে পর্তুগালকে বিশ্বকাপ দিতে পারেন, বিশ্বাস করেন তাঁর আসন্ন প্রতিপক্ষ কোচই। কুইরোজ তো বলে দিলেন, পর্তুগাল শুধু বিশ্বকাপ কাঁপাতে আসেনি। বিশ্বকাপ তারা জিততে এসেছে! “আমি তো বলব ফেভারিট,” বলে দিয়েছেন কুইরোজ। “পর্তুগাল পাশবিক খিদে নিয়ে বিশ্বকাপটা খেলতে এসেছে। যে কোনও সময় যে কোনও বিপক্ষকে ওরা ছিড়েখুঁড়ে ফেলতে পারে। আমাকে বলুন তো, বিশ্বের ক’টা টিম বার্সেলোনা, মোনাকো, ইন্টারের মতো ক্লাব প্লেয়ারকে বাইরে রেখে বিশ্বকাপ খেলতে আসার সাহস দেখায়? পর্তুগাল কিন্তু দেখিয়েছে। এটাই বোঝায়, ওরা কতটা ভয়ঙ্কর টিম। যে টিমে রোম্যান্স আছে। বাস্তববোধ আছে। বিপক্ষকে সম্মান দেওয়া আছে। আছে সাহস, কাঠিন্য, দায়বদ্ধতা আর একটা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো!”
[ OMG! বিশ্বকাপের ট্রফিতে কোকেন, বড়সড় চক্রের হদিশ ]
যুদ্ধের আগে প্রতিপক্ষ ‘বাঙ্কার’ থেকে পাওয়া এমন শংসাপত্র পায় ক’জন? যতই ইরান কোচের গায়ে পর্তুগিজ রক্ত থাক, বাস্তবে তিনি তো ইরান কোচ। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ইরান নিয়ে স্বপ্ন দেখেন না? উত্তরে কুইরোজ বলেন, “দেখি। কিন্তু পর্তুগাল বড় শক্ত টিম। আমরা ঠিক করেছি, বেশি না ভেবে মাঠে শুধু আনন্দ করতে নামব।” কুইরোজ ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেন, কুরুক্ষেত্রের নিয়ম অগ্রাহ্য করে সোমবার জয় নয়, হারলেই বেশি খুশি হবেন। তিনি দক্ষ দ্রোণাচার্য হতে পারেন। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো তাঁরই দেশের ‘অর্জুন’ তো!