সৌরভ মাজি, বর্ধমান: মাস দেড়েক আগে ডাইনি অপবাদে ভাই-বোনকে পিটিয়ে খুন করার ঘটনার কথা উঠে এসেছিল শিরোনামে। তদন্তে গিয়ে গ্রামে ঢুকতে পারেনি পুলিশ ও প্রশাসন। পরে বিশাল বাহিনী গিয়ে মোড়লদের বাধা অতিক্রম করে গ্রামে ঢোকে। সোমবার রাতেও প্রায় একই ঘটনার সাক্ষী রইল পূর্ব বর্ধমানের রায়না।
রায়না থানার বোরো বলরামপুরের বাথানডাঙায় এক মহিলাকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে মারধর করেছিল একদল গ্রামবাসী। খবর পেয়ে উদ্ধারে গেলে আক্রান্ত হন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তারাও। পুলিশকর্মীদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। ইট-পাটকেলও ছোঁড়া হয় তাঁদের দিকে। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়িও। পরে বিশাল পুলিশবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ১৭ জনকে। মঙ্গলবার ধৃতদের বর্ধমান আদালতে পেশ করা হয়। সিজেএম রতনকুমার গুপ্তা ধৃতদের রবিবার পর্যন্ত বিচারবিভাগীয় হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।
[মুর্শিদাবাদে কী করে মাদক পাচার করে চিনারা? পুলিশের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী]
রায়না থানার ওসি সুদীপ্ত মুখোপাধ্যায় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ৪২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ৬টি বাঁশ, ১১টি লাঠি, ৪টি রড-সহ বিভিন্ন সামগ্রী বাজেয়াপ্ত করেছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতরা বোরো বাথানডাঙা, খণ্ডঘোষের খোরকোল, মেমারির বড়োয়া ও হুগলির পাণ্ডুয়া থানার বিল্বসরার বাসিন্দা। গ্রামবাসীদের হামলায় সাব ইনস্পেক্টর তরুণকুমার লেট, সোমনাথ মুখোপাধ্যায়, কনস্টেবল শেখ মোবারক আলি, স্বপনকুমার দাস, রামপ্রসাদ দাস, হোমগার্ড রাজু মালিক, ভিলেজ পুলিশ সৌরভ সাঁই এবং সিভিক ভলান্টিয়ার অভিজিৎ শর্মা জখম হন। জেলা পুলিশের এক আধিকারিক জানান, ডাইনি অপবাদ দিয়ে এক মহিলা ও এক ওঝাকে মারধর করার খবর পেয়ে গ্রামে গেলে পুলিশে উপর হামলা হয়। পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় জানান, ঘটনায় মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে গ্রামে প্রচার চালানো হবে। সচেতনতা শিবিরও করা হবে।
[পরিচ্ছন্নতায় জোর, মিড-ডে মিলের জন্যে তৈরি হবে ডাইনিং হল]
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রামের বছর একুশের তরুণী মৌসুমী ক্ষেত্রপাল কিছুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। বাসিন্দাদের ধারণা হয় প্রতিবেশী নমিতা ক্ষেত্রপাল ডাইনি। তার কালাজাদুতেই অসুস্থ হয়েছে মৌসুমী। শুধু তাই নয় এই অপবিদ্যার প্রয়োগে গ্রামের আরও অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের ভূতে ধরেছে। মৌসুমী ও বাকি অসুস্থদের ঘাড় থেকে ভূত নামাতে সোমবার রাতে নমিতার বাড়িতে চড়াও হয় প্রায় দেড়শো গ্রামবাসী। ফোন করে ঝুমাকে ডেকে আনা হয়। মৌসুমীর ঝাড়ফুঁক করানো হয়। খবর পেয়ে গ্রামে যান রায়না-১ বিডিও। সঙ্গে ছিল পুলিশও। ঝাড়ফুঁক বন্ধ করতে বলা হয়। কিন্তু তাতে কেউই কর্ণপাত করেনি। পুলিশ বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোঁড়া হয়। মারধর করা হয় নমিতা ও ঝুমাকে। ভাঙচুর করা হয় নমিতার বাড়ি। এরপর উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক চিকিৎসককে এনে মৌসুমীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করানো হয়। এরপর নমিতা ও ঝুমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় পুলিশ।
ছবি: মুকুলেসুর রহমান