ব্রতদীপ ভট্টাচার্য: মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গা। যাকে অসুর সংহারের রুদ্ররূপেই চেনেন বেশিরভাগ মানুষ। হাতে ত্রিশূল, রক্তচক্ষু, সিংহের পিঠে চেপে মহিষাসুরকে বধ করছেন দেবী। বাড়ির ঠাকুর দালানেই হোক বা থিমের মণ্ডপে, দেবীর এই রূপকেই বিভিন্নভাবে সাজান শিল্পীরা। কিন্তু ঝামাপুকুরের চন্দ্রবাড়িতে দুর্গাপুজো যেন মূল স্রোত ছেড়ে অন্য খাতে বয়। এখানে দেবী অসুরবিনাশিনী নন, কারণ চন্দ্রবাড়ির প্রতিমায় অসুরই নেই। দেবীর দশ হাত নেই, রক্তচক্ষু নেই। তাঁর যুদ্ধংদেহি রূপও নেই। ঝামাপুকুরের চন্দ্রবাড়ির ঠাকুর দালানে দেখা যায়, বাঘছালের উপর শিবের কোলে বসে আছেন দ্বিভুজা দেবী দুর্গা। শুনে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব। প্রায় ২৫০ বছরের বেশি সময় ধরে চন্দ্র পরিবারের মণ্ডপে এভাবেই পূজিত হয়ে আসছেন দেবী দুর্গা।
১৭৬১-৬২ সাল নাগাদ ব্যবসার সূত্রে হুগলি থেকে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে এসেছিলেন সোনার ব্যবসায়ী রামপ্রসাদ চন্দ্র। সেই বসত বাড়িতেই ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর প্রতিষ্ঠা হয়। ইতিহাস বলছে, রামপ্রসাদের পর তাঁর উত্তরসূরি সুবলচাঁদ চন্দ্র নতুন বসতবাটি তৈরি করেন ঝামাপুকুর এলাকায়। সময়টা ছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি। জোড়াসাঁকো থেকে চন্দ্রবাড়ির পুজোও চলে আসে ঝামাপুকুরে। জায়গা বদলালেও পুজোর রীতি একই রয়েছে। রামপ্রসাদ যে শিবদুর্গা মূর্তিতে জোড়াসাঁকোয় পুজো শুরু
করেছিলেন, পারিবারিক পরম্পরার সে ধারাবাহিকতাই বজায় থাকে ঝামাপুকুরের বাড়িতেও। সুবলচাঁদ ছিলেন সে সময়কার অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের একজন। বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন-এর সদস্য হিসাবে ইতিহাসে তাঁর নাম রয়েছে। ম্যাঞ্চেস্টারে কটন মিলের মালিক ছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই সুবলচাঁদের সময়ে চন্দ্রবাড়ির পুজোর প্রতিপত্তি বাড়ে। লোকমুখে শোনা যায়, সুবলচাঁদের সময়ে চন্দ্রবাড়ির পুজোয় নিয়মিতভাবে মাকে নিয়ে আসতেন বিদ্যাসাগর মহাশয়ও।
[স্বপ্নাদেশে মুসলিম পরিবারের ভোগ খেতে চেয়েছিলেন এই বাড়ির দেবী]
২৪-এ বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ঝামাপুকুরের চন্দ্রবাড়ির পুজোর বৈশিষ্ট্য তাঁদের দেবী প্রতিমায়। কলকাতার সর্বজনীন বা বারোয়ারি পুজোর ভিড়ে চন্দ্রবাড়ির প্রতিমা বিরল বলাই চলে। এ বাড়ির ঐতিহ্য শিবদুর্গা মূর্তি। চন্দ্রবাড়ির মূর্তিতে দেখা যায়, দেবী দুর্গা শিবের কোলে বসে আছেন। পাশে লক্ষ্মী, কার্তিক, সরস্বতী, ও গণেশ। দেবীর সঙ্গে নেই শুধু অসুর। এমন মূর্তির তাৎপর্য কী? চন্দ্র পরিবারের লোকেদের থেকে জানা যায়, এ বাড়ির পুজো বৈষ্ণবমতে হয়। তাই দেবীর সংহারের রূপ এখানে দেখা যায় না। দেবী এখানে শান্ত রূপে পূজিত হন। প্রশ্ন উঠতে পারে, অনেক বনেদি বাড়িতেই বৈষ্ণবমতে পুজো হয়ে থাকে। কিন্তু সব জায়গায় তো দেবীর শিবদুর্গা রূপ দেখা যায় না! এই প্রশ্নের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা চন্দ্রবাড়ির বর্তমান প্রজন্মের কাছে নেই। তাঁদের দাবি, পরিবারিক নিয়ম মেনেই ঐতিহ্যকে অনুসরণ করছেন তাঁরা। কিন্তু শিবদুর্গা মূর্তিতে পুজোর নেপথ্যের কাহিনিটা তাঁদের জানা নেই। প্রকৃত অর্থে চন্দ্রবাড়ির পুজোয় প্রতি পদেই ঐতিহ্যর ছোঁয়া পাওয়া যায়। এ বাড়ির প্রতিমা বংশানুক্রমে তৈরি করেন একই মৃৎশিল্পীর পরিবার। পুরোহিতও সেই আদিকাল থেকে একই পরিবারের। এ বাড়ির আরও একটি ঐতিহ্য, মহিলাদের পরিধেয়। পুজোর ক’দিন এই পরিবারের মহিলাদের পরনে থাকে সনাতনী শাড়ি, গয়না নাকের নথ যার অন্যতম অংশ।