কৃষ্ণকুমার দাস, গান্ধীনগর: পূণ্যতোয়া সবরমতী তীরে যেখানে মহাত্মা গান্ধী আশ্রম গড়েছিলেন পুরাণ মতে সেখানেই ছিল দধীচি মুনির আশ্রম। যে দধীচির অস্থি দিয়ে তৈরি বজ্রে অসুর বধ করে স্বর্গকে কলঙ্কমুক্ত করেছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। আর মহাত্মা এই আশ্রম থেকে ডান্ডি যাত্রা করে ব্রিটিশকে ভারতছাড়া করেছিলেন। এবার ভোটে ফের সবরমতীর সামনে পরীক্ষা।
[ভুল করে বসপার বদলে বিজেপিকে ভোট, আঙুল কাটলেন যুবক]
লোকসভা ভোটের ঠিক আগে মহাত্মার সেই ডান্ডি যাত্রার দিনে ১২ মার্চ সবরমতীতে এসে দলের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে নির্বাচনী রণকৌশল ঠিক করেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। অবশ্য তারও মাস কয়েক আগে এই আশ্রমের বাগানেই এক দোলনায় বসে দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি ও শি জিংপিং। মহাত্মার প্রার্থনা মন্দিরের অনতিদূরে চিনা প্রেসিডেন্ট সেদিন প্রতিবেশীর বিজ্ঞান-গবেষণাকে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে যে স্বীকারোক্তি করেছিলেন তা গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। গান্ধীনগরের নির্বাচনী প্রচারে এবার দেশরক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান-গবেষণাও অন্যতম আবেগদীপ্ত ইস্যু। আবার মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে লড়াইয়ে ঘোষণার শুরুও এই সবরমতীর ছোঁয়া নিয়েই।
দেশকে পাঁচবছর সামলে দিল্লির কুর্সি ফের দখলে রাখার স্বপ্নের সওদাগর নরেন্দ্র মোদির ভাবনার কেন্দ্রভূমি গান্ধীর জন্মভূমি গুজরাট। মজার কথা, এই সবরমতী থেকে যাত্রা শুরু করে ফের কংগ্রেসকে প্রথমসারিতে এনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন রাহুল। আর মোদি সেই সবরমতীকে সামনে রেখেই কংগ্রেসকে পাকাপাকিভাবে নিশ্চিহ্ন করে বিজেপিকে আরও উজ্জ্বল করার শপথ নিয়েছেন। এই সমীকরণ যে কতটা বাস্তব, তা অনুভব করছি সবরমতীতে আসা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গান্ধী-অনুরাগীদের মধ্যেও। আশ্রমে আসা বিদেশি সাংবাদিকদেরও কৌতূহল প্রচুর। আগ্রহ যতটা না কস্তুরবার অন্দরমহলে, তার চেয়ে বেশি আগ্রহ সবরমতী আশ্রম যে লোকসভা কেন্দ্রে সেই গান্ধীনগরের ফলাফল নিয়ে।
সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে আরও এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মহাত্মার নামে চলা গান্ধীনগর আসন। ছ’বারের সাংসদ বিজেপির লৌহপুরুষ লালকৃষ্ণ আডবানীকে বাদ দিয়ে এবার প্রার্থী দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ। গতবার মোদি বারাণসী থেকে প্রার্থী হওয়ায় যতটা না সেদিকে নজর ছিল তার থেকেও অনেক বেশি রাজনৈতিক চোখ রয়েছে গুজরাটের এই আসনের মার্জিনের দিকে। কারণ, এই আসন থেকে ১৯৯৬ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ী সংসদে গিয়েছিলেন। দু’বছর পর এই আসনে প্রার্থী হন লালকৃষ্ণ আডবানী। তারপর থেকে টানা জিতছেন। তথ্য হল, ১৯৮২ সালে এই কেন্দ্রের নারানপুরার সাংভি হাইস্কুলে জনসংঘের প্রার্থীর হয়ে পোলিং বুথের দায়িত্ব সামলেছিলেন অমিত শাহ। পরবর্তীকালে প্রথমে গুজরাটের সরখেজ কেন্দ্র এবং পরে নারানপুরা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন অমিত শাহ। আর এবার একেবারে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদির অনুরোধে বিজেপির ‘স্টার ক্যান্ডিডেট’দের জন্য নিশ্চিত আসন গান্ধীনগর থেকে প্রার্থী তিনি। আডবানীর স্মৃতি মুছে কর্মীদের দম দিয়ে নামিয়ে দিয়েছেন ভোটের মার্জিনে ইতিহাস গড়ার টার্গেট দিয়ে।
মনোনয়ন দেওয়ার পর পয়লা বৈশাখ প্রচারে এসে গান্ধীনগরের সহকর্মীদের জানিয়ে গেছেন, শুধু জিতলে হবে না, মার্জিন বাড়িয়ে সম্মান রাখতে হবে দেশের। আসলে আডবানীর চেয়ে যদি মার্জিন না বাড়ে তবে যে জয়ের মালায় কাঁটা থেকে যাবেই তা বিলক্ষণ জানেন মোদির প্রধান সেনাপতি। তাই খামতি নেই, বিরোধীশিবির ভেঙে নিজের ভোটব্যাংকের সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলার। সংসদীয় কেন্দ্রের দুই বিধানসভা কালোল ও গান্ধীনগর-উত্তর রয়েছে কংগ্রেসের দখলে। তাই নিজের ভদ্রাসন নারানপুরার চেয়ে কংগ্রেসের এই দুই বিধায়কের ডেরায় বেশি র্যালি করলেন বিজেপি সভাপতি।
বাঘেলা রাজবংশের শেষ রাজা কর্ণদেব ভিল সর্দারকে হারিয়ে শহরের নাম আসাবল থেকে বদলে রাখেন কর্ণাবতী। পরে গুজরাটের শাসক আলফ খাঁ এই সিংহাসনে বসেন আহমেদ শাহ নাম নিয়ে। রাজধানীর নামও নিজের নামে রাখেন আমেদাবাদ। কিন্তু ১৯৭০ সালে ফরাসি স্থপতির হাত ধরে ২৩ কিমি দূরে ভারতের আধুনিকতম শহর গান্ধীনগরে সরে যায় রাজ্যের রাজধানী। শহরে যত ঘুরছি চোখে পড়ছে মোগল আমলের মসজিদ, অক্ষরধাম-স্বামীনারায়ণ মন্দিরের মতো স্থাপত্য। এই অঞ্চলে ১৩ শতাংশ প্যাটেল ও ১১ শতাংশ ঠাকুর সম্প্রদায়ের বাস। কেন্দ্রের ভেজলপুর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রায় ৪০ শতাংশ মুসলিম ভোটার। কংগ্রেস প্রার্থী প্রাক্তন আমলা সি জে চাভদা দাবি করছেন, এই তিন সম্প্রদায়ের ভোট হাত চিহ্নে যাবেই যাবে।
গান্ধীনগর কেন্দ্রের তিন বিধানসভা ঘুরে আদবানি-অমিত শাহ দ্বন্দ্বের উত্তাপ বোঝার চেষ্টা করছিলাম। কতটা সহানুভূতি আছে বয়োবৃদ্ধ আডবানীর জন্য গুজরাতের অন্তরে। সবরমতী আশ্রমের কর্মী রাজুভাই জাদেজা থেকে আমেদাবাদের কর্পোরেট কর্তা মনসুখ প্যাটেল, সবার এক কথা, “ভোট বরাবর বিজেপিকে দিই। কিন্তু এবার ভূমিপুত্র অমিত শাহকে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি।” গুজরাট বিজেপির যুবমোর্চার রাজ্য সভাপতি ড. রুতবিজ প্যাটেল খুল্লাম খুল্লা বললেন, “আগে যাঁরা প্রার্থী হতেন তাঁদের পাঁচ বছরে একবার দেখতে পেতাম। ভোট হয়ে গেলে আর নর্মদা তিরে পা রাখতেন না। এবার ঘরের ছেলে প্রার্থী। দিনরাত আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। হাজার হাজার কর্মীর ঘরের মানুষ।” আত্মবিশ্বাসী গলায় রুতবিজ বললেন, “দেখে নেবেন আডবানীজির চেয়েও বেশি মার্জিনে জিতবেন অমিতজি।”
গতবার ৪.৮৩ লাখ ভোটে জিতেছিলেন আডবানী। অমিত শাহর বিরুদ্ধে প্রার্থী কংগ্রেসের সিজে চাভদা। আমেদাবাদের কেন্দ্রস্থল মানেকপুরায় নির্বাচনী অফিস। তাঁর প্রচারের ইস্যু বিজেপির কৃষকদের উপেক্ষা ও অমিত শাহের ছেলের সম্পদ বৃদ্ধির তথ্য। দাবি করছেন, গ্রামীণ তিন কেন্দ্র, কালোল, সানন্দ ও গান্ধীনগর-উত্তর কেন্দ্র থেকে জিতবে কংগ্রেস। শহুরে কিছু ভোট পাবেন অমিত শাহ। তবে একটা তথ্য দিলে ছবিটা স্পষ্ট হবে– শহরের তরুণ প্রজন্ম কিন্তু পুরোটাই পদ্ম শিবিরে ঝুঁকে। সন্ধ্যায় কফি খেতে ঢুকেছিলাম শপিং মলে। রেস্তরাঁর টেবিল প্রথমবারের ভোটারে ভর্তি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ভিকি, নারিন, দীনেশরা সবাই প্রথমবার ভোট দেবেন ২৩ এপ্রিল। ভোট কাকে দেবে প্রশ্নটা শেষ হয়নি, সপাটে ধোনির হেলিকপ্টার শট মারার ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে ব্যাট চালালেন। পালটা প্রশ্ন ছুড়ে তিনজনই একসঙ্গে বললেন, “এটা দেশের ভোট। মোদিজির বিকল্প কেউ নেই। ওঁর পার্সোনালিটির কাছাকাছি কেউ আছে নাকি? থাকলে জানাবেন।”
[ভারতের নির্বাচন থেকে দূরে থাকুন, ইমরানকে কড়া বার্তা রাম মাধবের]