শুভময় মণ্ডল: প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো কলেজ৷ কত ইতিহাস, কত স্মৃতি, কত সংগ্রামের ধারক-বাহক৷ উত্তর কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে স্থাপিত বিদ্যাসাগর কলেজ রাতারাতিই খবরের শিরোনামে৷ না, কোনও সুখ্যাতির কারণে নয়৷ মঙ্গলবার সন্ধেয় সেখানে যা ঘটেছে, তা আপামর বাঙালির মাথা নত করে দিয়েছে৷ যাঁর অনুপ্রেরণায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে এত বছরের পুরনো এক কলেজ, সেই ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহ্যবাহী মূর্তি ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছে৷ এমন ঘটনায় বিস্মিত, আহত কলেজের শিক্ষক থেকে অশিক্ষক কর্মী, ছাত্রছাত্রী থেকে প্রাক্তনীরা৷ তাঁদের প্রতিক্রিয়া উঠে এল এই প্রতিবেদনে –
[আরও পড়ুন: মূর্তি ভাঙার ‘প্রমাণ’ দিয়ে ভিডিও প্রকাশ তৃণমূলের, পালটা ফুটেজ দেখাল বিজেপিও]
সঞ্চারী গোস্বামী (অধ্যাপক, ফিজিক্স,বিদ্যাসাগর কলেজ)
‘‘কীভাবে নিন্দা করব গতকালের ঘটনার? আমার জানা নেই। কোনও ভাষাতেই এমন একটি ঘটনার সঠিক প্রতিবাদ হয় না হয়ত। যে কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই এমন ঘটনা অনভিপ্রেত। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় যে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো। কেবল প্রাচীনত্বের নিরিখেই এটি বিখ্যাত নয়, এর বিখ্যাত হওয়ার আরেকটি কারণ, এটি সম্পূর্ণ ব্রিটিশ অধীনস্থ ভারতের টাকায় তৈরি৷ ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত প্রথম বেসরকারি কলেজ। আর এর প্রাক্তন ছাত্রতালিকা দেখলে মাথা আপনিই নত হয়ে আসবে যে কোনও শিক্ষিত মানুষের। এমন একটি কলেজের সঙ্গে অন্যায় মেনে নেওয়া কষ্টকর। প্রকৃত শিক্ষা থাকলে এমন একটি ঐতিহাসিক আলোকপ্রাপ্ত কলেজের সঙ্গে অন্যায় করা যায় না।
তবু আশা রাখি, এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কলঙ্কলেপন করলে ইতিহাসের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে না। তবু আশা থাকে, যে কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সমাজের অন্যায়গুলোর মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন যিনি, সাহেবের মুখের সামনে চটি তুলে বসার স্পর্ধা ছিল যাঁর, তিনি নিশ্চয়ই শিক্ষার আলোতেই পথ দেখাবেন আমাদের…হয়ত এবারে ভয় না পেয়ে, রঙ না দেখে, দল না চিনে, শুধু কলেজটার জন্যই পাশাপাশি দাঁড়াবেন কলেজের সমস্ত কর্মী। আজ আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর দিন৷’’
[আরও পড়ুন: “বঙ্গ সংস্কৃতির অহংকার ভূলুণ্ঠিত,” মত বিদ্বজনদের]
ভাস্কর ঘোষ (প্রাক্তন ছাত্র, বিদ্যাসাগর কলেজ)
‘‘কেউ কেউ তাঁকে শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ তাঁকে রবীন্দ্রনাথের থেকেও আগে রেখেছেন। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘…তাঁর দেশের লোক যে যুগে বদ্ধ হয়ে আছেন, বিদ্যাসাগর সেই যুগকে ছাড়িয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ সেই বড় যুগে তাঁর জন্ম, যার মধ্যে আধুনিক কালেরও স্থান আছে, যা ভাবীকালকে প্রত্যাখ্যান করে না। যে গঙ্গা মরে গেছে তার মধ্যে স্রোত নেই, কিন্তু ডোবা আছে, বহমান গঙ্গা তার থেকে সরে এসেছে, সমুদ্রের সঙ্গে তার যোগ। এই গঙ্গাকেই বলি আধুনিক। বহমান কালগঙ্গার সঙ্গেই বিদ্যাসাগরের জীবনধারার মিলন ছিল, এই জন্য বিদ্যাসাগর ছিলেন আধুনিক।’
সেই ঈশ্বরচন্দ্রের ওপর কলকাতায় গতকাল হামলা হলো। সত্যিই আমাদের মুখ লুকানোর জায়গা নেই। আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে আমাদের প্রিয় কলকাতায় আরও একবার এইরকম কাপুরুষোচিত আক্রমণ ঈশ্বরচন্দ্রের ওপর হয়েছিল। কারা করেছেন, কেন করেছেন সেই রহস্য উদঘাটন আমার আজকের বিষয় নয়। আমি একটাই প্রার্থনা করব সমস্ত রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষের কাছে – আপনারা সংযত হোন। হিংসা, অশান্তি আর নয়। চৈতন্য মহাপ্রভু, রামকৃষ্ণদেব, যিশু, মহম্মদ, গুরু নানক, বুদ্ধদেব, মহাবীর জৈন – কেউই হিংসার বাণী ছড়াননি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধী, অটলবিহারী বাজপেয়ী – প্রত্যেকেই নিজেদের সমালোচনা শোনার ক্ষমতা রাখতেন। হিংসা কোনও পথ দেখায় না। যুক্তিপূর্ণ ভাবনা সবসময়েই সঠিক পথ দেখায়। বিশেষ করে সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাছে আমার আবেদন পরিস্থিতি শান্ত রাখুন। একমাত্র আপনারাই এটা পারেন। গতকাল সন্ধ্যায় যখন নারকীয় তাণ্ডব চলছে, হঠাৎ মনে হলো বীরসিংহ গ্রামের পুরুষসিংহ যেন বলার চেষ্টা করছেন –
‘যদি থাকি কাছাকাছি,
দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি –
তবু মনে রেখো।’
আসুন আমরা সবাই শপথ নিই এই দিন ভবিষ্যতে যেন আর না দেখতে হয়। জয় হোক শুভ বুদ্ধির। জয় হোক মানবতার।’’