সুমিত বিশ্বাস,পুরুলিয়া: প্রশাসনের কঠোর পরিশ্রম এবার আর বিফলে গেল না৷ শিকার বাদ দিয়েই বুদ্ধপূর্ণিমার উৎসবে মাতলেন অযোধ্যা পাহাড়ের শিকারিরা। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের জঙ্গলে বন্যপ্রাণ হত্যা রুখতে আদিবাসীদের প্রতি বনবিভাগ তথা জেলা প্রশাসনের স্লোগানই ছিল, ‘শিকার নয়, উৎসবে মাতুন।’ শনিবার সেই স্লোগানেই যেন গলা মেলালেন এই পাহাড়ের শিকারিরা।
[আরও পড়ুন: ফের আত্মহত্যা বিশ্বভারতীতে, হস্টেল থেকে উদ্ধার ছাত্রের ঝুলন্ত দেহ]
তবে তার মধ্যেও বিক্ষিপ্ত ঘটনা এড়ানো গেল না৷ শিকারিদের বল্লমের খোঁচায় প্রাণ গেল একাধিক বুনো শুয়োরের। তা শিকার করে বাড়ি ফেরার ছবিও ধরা পড়ল। গুঞ্জন, হরিণও শিকার করা হয়েছে। তবে তার কোনও প্রমাণ মেলেনি। ফলে সবে মিলিয়ে শিকার রুখতে যেন অনেকটাই সফল হল বনদপ্তর। পুরুলিয়া বিভাগের ডিএফও রামপ্রসাদ বদানা জানিয়েছেন, ‘শিকার আমরা রুখে দিতে পেরেছি। আমাদের বার্তায় সাড়া দিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষজন।’ এদিনও বলরামপুরের কলাবেড়া ও বাঘমুন্ডির টারপানিয়ায় বনকর্মীরা শিকারের একাধিক অস্ত্রশস্ত্র বাজেয়াপ্ত করে। সেই সঙ্গে টারপানিয়া গ্রামে একটি খরগোশ উদ্ধার করে জঙ্গলে ছেড়ে দেন বাঘমুন্ডি বনাঞ্চলের বনকর্মীরা।
বেশ কয়েকবছর ধরেই পাহাড়ে এই শিকার রুখতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বনদফতর। কোনওবারই তেমন সাফল্য মেলেনি৷ প্রচার সত্ত্বেও বুদ্ধপূর্ণিমায় অযোধ্যার জঙ্গলে শিকারের চিত্র বদলায়নি৷ কিন্তু এবার শিকার রুখে দিতে অনেকাংশেই সফল হল বনদপ্তর। অন্যান্য বছর একেবারে নির্বিচারে শিকারিদের তিরধনুক, বল্লমের খোঁচায় হরিণ, বুনো শূকর. এমনকী জাতীয় পাখি ময়ূরও বেঘোরে প্রাণ হারায়৷ শিকার করা হত সাপ, বুনো খরগোশও। তাছাড়া অতীতে ভল্লুকও শিকার হত।
[আরও পড়ুন: নিজের উর্বর জমি বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল প্রৌঢ়ের, পথ অবরোধ করে প্রতিবাদ]
শুধু বনদপ্তরের কর্মীদের জঙ্গলে টহল দিয়ে অভিযান বা পুলিশের নজরদারিই নয়। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজনকে সঙ্গে নিয়ে গত দু’মাস ধরে শিকার রুখতে যে ধারাবাহিক প্রচার চলেছে প্রশাসনের তরফে, এবছর তারই সুফল মিলল হল বলে মনে করছে বনদপ্তর। আসলে বনকর্মীরা পাহাড়ের আদিবাসী মানুষজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে তাঁদের বোঝাতে পেরেছেন, তাদের জঙ্গলে থাকা বন্যপ্রাণ হত্যা করলে পরিবেশের ভারসাম্য থাকবে না। বনদফতরের এই বার্তাতেই সাড়া দিয়েছেন অযোধ্যা পাহাড়ের বাসিন্দারা৷
শিকারির দল জঙ্গলে গেলেও সেভাবে বন্যপ্রাণ হত্যা করেননি। শুধু দীর্ঘদিনের নিয়ম মেনে শিকার করার অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একেবারে যোদ্ধার মত জঙ্গলে পা রেখেছেন – এইটুকুই। এদিনও শিকারিরাও শিকার শেষে ঘরে ফিরলে আদিবাসী জনজাতির মানুষজন সেই পরিবারের সদস্য তথা শিকারিকে ‘বীর’-এর মর্যাদা দিয়ে পা ধুইয়ে দেন মহিলারা। তেল–হলুদ-জল দিয়ে ধোওয়ানো হয় পুরুষ সদস্যের পা৷ পুরুলিয়ার বলরামপুরের ঘাটবেড়ায় এদিন সেই ছবিও দেখা গেল।

প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি দাবদাহে সমগ্র পাহাড়ে চরকির মত পাক খাচ্ছিল পুলিশ ও বনদপ্তরের গাড়ি। তবে এবার ভোটের মরশুম হওয়ায় সেভাবে শিকারিদের পাহাড়ে দেখা যায়নি। অথচ অতীতে এই পাহাড়ে এই রাজ্য-সহ ঝাড়খন্ড, ওড়িশা এমনকী অসম থেকেও শিকারীরা এই পাহাড়ে আসতেন। তবে এই ‘শিকার পরব’ এখন যেন সকলের হয়ে গিয়েছে। তাই আদিবাসী জনজাতির মানুষজন ছাড়াও অন্যান্যরাও বুদ্ধ পূর্ণিমায় এই পাহাড়ে এসে উৎসবে মেতে ওঠেন। চলে বনভোজনও। কিঁদরীর সুর আর ধামসা–মাদলের বোলে পূর্ণিমার রাতে পাহাড়ের মায়াবী পরিবেশে যেন অন্য জগতের ছবি ফুটে ওঠে৷
[আরও পড়ুন: কলকাতায় মূর্তিকাণ্ড, বালুরঘাটে অবহেলিত বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতি রক্ষার দাবি]
ঝাড়খন্ডের চান্ডিলের কাটিয়ারের ভৃগু হাঁসদা ও দিলীপ মাজি শিকারের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাহাড়ে আসেন। তাঁদের কথায়, ‘এই পরবের সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে। তাই আমরা ফি বছর আসি। এবার এখানে এসে উৎসবে মাতলাম।’ কিঁদরি, শিঙা, ধামসা-মাদলে, উৎসবের মেজাজে বুদ্ধপূর্ণিমায় অযোধ্যা পাহাড়জুড়ে যেন প্রতিধ্বনিত হল অহিংসার বার্তা।
ছবি: অমিত সিং দেও৷