সুতীর্থ চক্রবর্তী: অর্থনৈতিক অবরোধ যে আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে কতখানি কার্যকর হাতিয়ার, তা ভারত-চিন সংকটে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে। মাত্র ৫৯টি অ্যাপ নিষিদ্ধ হওয়াতেই ড্রাগন সেনা লাদাখে সুড়সুড় করে পিছু হটতে শুরু করেছে। এই নিবন্ধটি লেখার সময় পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সূত্রে যা খবর মিলছে, তাতে দু’পক্ষের কোর কমান্ডার স্তরের বৈঠকের সিদ্ধান্ত মেনে গালওয়ান উপত্যকায় এক থেকে দু’কিলোমিটার পর্যন্ত পিছিয়ে গিয়েছে চিনের পিপল্স লিবারেশন আর্মি। গালওয়ান নদীর চরে এখনও চিনা বাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ি ও তাঁবুগুলি থাকলেও তারা আলোচনায় আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং ভারতীয় সেনা পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে চিনা বিদেশমন্ত্রীর একদফা বৈঠকও ইতিবাচক। চিনের (China) অভিসন্ধি যাই থাকুক, এই দ্বন্দ্ব নিরসনে যে যুদ্ধ কোনও পথ নয়, তা ভারতের বিভিন্ন পদক্ষেপে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে সেনার ফরওয়ার্ড পোস্ট পরিদর্শনে গেলেও যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দেননি। এমনকী, মুখে চিনের নামও আনেননি। যুদ্ধ না করা মানেই সমঝোতা নয়। আলোচনার পথ খোলা রেখে অন্য উপায়ে চাপ তৈরি করে সীমান্তে স্থিতাবস্থা ফেরানো গেলে, তার চেয়ে ভাল কিছু হয় না।
[আরও পড়ুন: দেশের স্বার্থের সঙ্গে আপস করেছে সরকার? লাদাখে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে প্রশ্ন রাহুলের]
লাদাখে যে ভারতের (India) যুদ্ধপ্রস্তুতি নেই, তেমনটা নয়। মিগ, সুখোই যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে অ্যাপাচে অ্যাটাক হেলিকপ্টার নিয়ে সারাদিন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার আশপাশে চক্কর কাটছে ভারতীয় বায়ুসেনা। বিশালবপু সি-১৭ গ্লোবমাস্টার এবং আইএল-৭৬ উড়ানে চাপিয়ে গালওয়ানের সুউচ্চ উপত্যকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেনাবাহিনীর ভারী ভারী ট্যাঙ্ক ও প্রচুর গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র। ৮২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাকে পাহারা দিতে লাদাখে পৌঁছে গিয়েছে প্রচুর বাহিনীও। চিনের সামরিক বাজেট ভারতের চারগুণ বা সেনার সংখ্যা ও অস্ত্রশস্ত্রে তারা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে– এই শুকনো তথ্যে অবশ্য শক্তির তুল্যমূল্য বিচার হবে না। বহু সমর বিশারদের মতেই লাদাখের ওই উচ্চতায় এই মুহূর্তে সুবিধাজনক অবস্থায় ভারত। যতই তারা সেনার সংখ্যা ও অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান হোক, চিনের পক্ষে চট করে লাদাখে সেসব জড়ো করা মুশকিল। যেটা ভারত ইতিমধ্যে করে ফেলেছে। লাদাখ ছাড়াও চিনের আরও ২০টি ফ্রন্টে সংঘাত চলছে। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত পাহারা দিতে তাদের বেশিরভাগ সেনা মোতায়েন রয়েছে। স্বশাসিত জিংজিয়াং প্রদেশে উইঘুর বিদ্রোহীদের সামলাতে প্রতিদিন নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে চিনাবাহিনীর একটি বড় অংশকে। মঙ্গোলিয়া, তাজাকিস্তান, কিরঘিজস্তান, কাজাখস্তান, লাওস, কম্বোডিয়া, কোরিয়া, এমনকী, নেপাল, ভুটান-সহ সব প্রতিবেশীর সঙ্গে চিনের ভূখণ্ড নিয়ে ঝামেলা। দক্ষিণ চিন সাগরে আধিপত্য নিয়েও চিনের লড়াই সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিলিপিন্স, জাপান এবং সুদূর ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও। তাদের ভূখণ্ড থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ার একটি দ্বীপেও মাছ ধরার অধিকার চাইছে চিন। তাদের বক্তব্য, শত শত বছর আগে থেকেই দক্ষিণ চিন সাগরের ওই দ্বীপটির অধিকার তাদের। চারপাশের সব ভূখণ্ড ও জলপথ একসময় তাদের ছিল– দাবি জানিয়ে চিনের এই ‘বিস্তারবাদী’ মনোভাবের বিরুদ্ধে এখন এতগুলি দেশ। এই এতগুলি ফ্রন্টে লড়াই সামলে লাদাখে ভারতকে মোকাবিলা করা ড্রাগনদের পক্ষে সহজ নয় বলেই সমর বিশারদদের অনেকের ধারণা। উপরন্তু আমেরিকা-চিন সম্পর্কের লাগাতার অবনতি হয়েছে। কোভিড মহামারীর কারণে ইউরোপের দেশগুলির সঙ্গেও চিনের দূরত্ব বাড়ছে।
যুদ্ধের পথে না গিয়েও চিনকে কোণঠাসা করার এই সুযোগ ভারতের হাতছাড়া করা উচিত নয়। কূটনৈতিক স্তরে যা জারিও রয়েছে। অনেকে এখন দেখছি ৩২ বছর আগে রাজীব গান্ধীকে বলা দেং জিয়াও পিংয়ের কথা স্মরণ করছেন। কী বলেছিলেন দেং? ‘ভারত ও চিন হাত মেলালে একুশ শতক এশিয়ার হবে।’ এ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই যে, ৩২ বছরে ড্রাগনদের সঙ্গে সখ্য বাড়াতে ভারত কার্পণ্য করেনি। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে লেনদেন বৃদ্ধির সেভাবে সুযোগ না থাকলেও ভারত গত তিন দশকে চিনা সংস্থা ও পণে্যর জন্য দেশের অর্থনীতি হাট করে খুলে দিয়েছে। তাতে কি দেংয়ের কথা ফলেছে? একুশ শতক কি অামাদের হয়েছে? ভারতের দারিদ্র ও বেকারত্ব নিশ্চয়ই সেকথা বলে না। মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য খুব দেংয়ের উদ্ধৃতি দিতেন। বলতেন, ‘বেড়ালের গায়ের রং দেখে লাভ নেই। ইঁদুর ধরতে পারলেই হল।’ দেংয়ের বাণী অনুসরণ করে শেষ পর্যন্ত গাড্ডাতেই পড়েছিলেন বুদ্ধবাবু। পুঁজির রং দেখে একটু সতর্ক হয়ে পদক্ষেপ করলে হয়তো বুদ্ধবাবু এইভাবে রাজ্য ও নিজের দলকে ডোবাতেন না। রাজ্যও শিল্প পেল না, বুদ্ধবাবুও ক্ষমতায় থাকলেন না। একইভাবে ৩২ বছর আগে দেংয়ের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে ড্রাগনদের জন্য দেশের অর্থনীতি এইভাবে হাট করে না খুললে দেশীয় শিল্পের এতটা করুণ হাল কি হত? এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
লাদাখ উত্তপ্ত হওয়ার অাগেই অবশ্য মোদি সরকার সতর্ক পদক্ষেপ করতে শুরু করেছিল। কোভিড মহামারী চিনের বিপদ সম্পর্কে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল। মোদি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ স্লোগান তোলার আগেই চিনা পুঁজি আসার পথ কিছুটা রুদ্ধ করেছিলেন। এপ্রিল মাসেই ভারত প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে স্বাভাবিক রাস্তায় (অটোমেটিক রুট) দেশীয় সংস্থায় প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নির আসার পথ বন্ধ করেছিল। সরকারের আশঙ্কা ছিল কোভিড ও লকডাউনের জেরে দেশের যেসব শিল্পসংস্থা নগদের অভাবে ধুঁকছে, সেগুলি চিনা সংস্থা এই সুযোগে অল্প দামে কিনে নিতে পারে। এতে অর্থনীতির চিন নির্ভরতা আরও বাড়ত। চিনা সংস্থার লগ্নি নিয়ন্ত্রণ করার একমাস পর মোদি তাঁর ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচি সামনে আনেন। যেটি প্রধানত চিনা পণে্যর আমদানির বিরুদ্ধে ভারতের বিকল্প প্রস্তুতির পরিকল্পনা। এর একমাস পর তৈরি হল লাদাখ সংকট। গালওয়ানে এক কর্নেল-সহ ২০ ভারতীয় জওয়ানের নৃশংস হত্যার পর প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসাবে কেন্দ্রের ‘ডিপার্টমেন্ট ফর প্রোমোশন অফ ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ইন্টারনাল ট্রেড’ ভারতীয় শিল্প ও বাণিজ্য সংস্থাগুলির কাছে অামদানিকৃত চিনা পণে্যর তালিকা চাইল। সর্বশেষ ভারতের ৫৯টি চিনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করে ‘ডিজিটাল স্ট্রাইক’। অ্যাপ নিষিদ্ধ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই চিনের ক্ষতির বহর ৬০০ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে। গালওয়ানে দ্রুত ড্রাগনের দাপাদাপি স্তিমিত হওয়া হয়তো তার প্রাথমিক লক্ষণ।
চিনের বিরুদ্ধে দেওয়াল তুললে ভারতীয় শিল্পসংস্থার জোগান শৃঙ্খলা ভেঙে গিয়ে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে বলেও একটি পালটা যুক্তি প্রবলভাবে খাড়া করার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রশ্ন করা হচ্ছে না যে, ওষুধ শিল্পের ৬৮ শতাংশ কাঁচামাল বা গাড়ি শিল্পের ২৭ শতাংশ কাঁচামাল চিন থেকে আমদানি করে এনে যদি আমরা আমাদের রপ্তানি দিনের পর দিন চালিয়ে যেতে থাকি, তাহলে ড্রাগনের হাঁ থেকে বেরনোর পথ কোথায়? চিনের সঙ্গে বাণিজ্যে যে আমাদের বছরে চার লক্ষ কোটি টাকার ঘাটতি, তা কোন পথে মিটবে, সেই প্রশ্নেরও জবাব নেই। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, চিনা অ্যাপের বিকল্প অ্যাপ তৈরি করতে ভারতীয় ‘স্টার্ট আপ’ সংস্থা এগিয়ে এলে সরকার লগ্নি করবে। চিনা ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’-এর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার দরকার নেই। সরকারের তরফে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। নীতিরও বড়সড় পরিবর্তন। ওষুধ, গাড়ি বা ইলেকট্রনিক্স শিল্পের কাঁচামালের জন্য আমরা পৃথিবীর অন্য কিছু দেশের সন্ধান করতে পারি। সর্বোপরি কোথাও বলা হয়নি যে, রাতারাতি সমস্ত চিনা পণ্যের আমদানি বন্ধ করা হবে। চিনের যে সমস্ত পণ্য আমাদের রপ্তানি শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহৃত হয়, সেগুলির আমদানি ধাপে ধাপে বন্ধ করার কথা ভাবা হোক। দ্রুত আমদানি বন্ধ হোক এমনসব পণ্যের, যেগুলি দেশে উৎপাদন করা সম্ভব এবং যেগুলি আসা বন্ধ হলে ধাক্কা খাবে না আমাদের রপ্তানি শিল্প। আশার কথা, এই পথেই কেন্দ্র এগিয়ে চলার আগ্রহ দেখাচ্ছে এখনও পর্যন্ত।
একটি তত্ত্ব বাজারে ঘুরপাক খাচ্ছে যে, চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তঁার ‘বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই), যা স্থল ও জলপথে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের দেশগুলিকে জুড়তে চায় ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষে্য, তাতে ভারতকে শামিল করতেই লাদাখে চাপ তৈরি করছিলেন। যদি সেটাই সতি্য হয়ে থাকে, তাহলে বলা যায়, স্নায়ুযুদ্ধে জিনপিংয়ের পরাজয় ঘটেছে। ‘বিআরআই’-তে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ভারত কোনও আশ্বাস দেয়নি। তা সত্ত্বেও লাদাখে পুরনো অবস্থানে সরতে হচ্ছে ড্রাগনদের। বরং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ ড্রাগনকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাল। দেশীয় ব্যবসায়ীদের একটি লবির চাপ উপেক্ষা করেও মোদি সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার।