সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: পার হয়ে গিয়েছে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময়। কিন্তু এখনও থমথমে সেই নডিহা। শোকের আবহের মধ্যে নিথর নডিহা সরব, অবিলম্বে কাড়া অর্থাৎ মোষের লড়াই বন্ধ হোক। মোষের লড়াই দেখতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পুরুলিয়ার (Purulia) পাড়ার এই গ্রামের বাসিন্দা রথু বাউরির বেঘোরে মৃত্যুতে বেআইনি ওই লড়াই বন্ধের দাবিতে সরব গোটা গ্রাম। এদিকে এই মোষের লড়াইয়ের আয়োজন করায় ১৪ জন আয়োজক-সহ অন্যান্যদের উল্লেখ করে পাড়া থানায় এফআইআর হয়েছে। রবিবার রাতেই অভিযুক্তদের মধ্যে সাফিউল আনসারি নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সোমবার ধৃতকে রঘুনাথপুর আদালতে তোলা হলে তার তিনদিন পুলিশ হেফাজত হয়।
এদিকে পুরুলিয়া মফস্বল থানার পুলিশ গোলামারা গ্রাম থেকে একটি পিকআপ ভ্যানকে আটক করেছে। যে মোষের আক্রমণে এই দর্শকের মৃত্যু হয়েছে সেই রসিকের বাড়ি পুরুলিয়া মফস্বল থানার গোলামারাতে। বাড়িতে তাকে না পেয়ে ওই ভ্যান আটক করে। পুরুলিয়া জেলা পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে। গত রবিবার পাড়া থানার হাতিমারা গ্রামে এই কাড়া লড়াই বা মোষের লড়াইয়ের মেলা বসেছিল।
[আরও পড়ুন: ফাঁকা বাড়িতে বেডরুমে ডেকে লাগাতার ‘ধর্ষণ’ নাবালিকাকে, বাগদায় গ্রেপ্তার স্কুল শিক্ষক]
সাবেক মানভূমের সংস্কৃতি এই কাড়া লড়াই, মোরগ লড়াই। কিন্তু যেভাবে জঙ্গলমহলের এই জেলায় ফি বছরই কাড়া লড়াই-এ একের পর এক দুর্ঘটনায় বেঘোরে প্রাণ যাচ্ছে উৎসাহী দর্শকদের। তাতে বহু মানুষই দাবি তুলেছেন, এই লড়াই বন্ধ করতেই হবে। কিন্তু মানভূম সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও মানুষজন তা মেনে নিতে পারছেন না। সবে মিলিয়ে বেআইনি হলেও আবেগের কাছে যেন হার মানছে প্রশাসনও। বর্ধিষ্ণু নডিহা গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি মোড়। সেই মোড় থেকে ডান দিকে গিয়ে বাঁদিকে আবাস যোজনার বাড়ি। সেই বাড়িটি মৃত রথু বাউরির। গত রবিবার এই পাড়া থানার হাতিমারা গ্রামে কাড়া লড়াই দেখতে গিয়ে যার প্রাণ যায়। এদিন তার বাড়ি পৌঁছতেই ভিড় জমে যায়। কীভাবে ঘটল সবকিছুর উত্তর পেতেই তার স্ত্রী ছেলে-মেয়ে সহ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ বললেন, “অবিলম্বে মোযের লড়াই বন্ধ হওয়া প্রয়োজন । স্ত্রী করুণা বাউরি, ৮০ বছরের বৃদ্ধা মা নিরি বাউরি, ২৭ বছরের বড় ছেলে শ্যামাপদ বাউরি সবার কথাই এক। এভাবে কাড়া লড়িয়ে তার থেকে আনন্দ পাওয়া। তারপর হেরে যাওয়া মোষের জয়ী মোষের তাড়া করলে দর্শকের দিকে ছুটে আসা। এমন বিনোদন বা খেলার কি দরকার? যেখানে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে! আমরা চাই অবিলম্বে কাড়া লড়াই বন্ধ করতে হবে।”

ঠিক কি হয়েছিল সেদিন? দিনমজুরের কাজ করা রথু বাউরি কালীপুজোর আগে মেয়েকে তার শ্বশুরবাড়ি চয়নপুর থেকে নিয়ে আসছিলেন। হাতিমারা গ্রামে কাড়া লড়াই থাকায় ছোট নাতির বায়নায় তিনিও মোষের লড়াই দেখতে বসে যান। এরই মধ্যে তার নাতি শৌচকর্ম করতে গেলে তার মেয়েও মালাও সেখানে যান। ফলে মোষের লড়াই মেতে ওঠেন রথু। ওই অবস্থায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে কিছুটা দূরে যান তিনি। সেই সময়ই ঘটে যায় অঘটন। পরাজিত মোষকেকে তাড়া করে নিয়ে আসে জয়ী মোষ। দিনমজুর রথু পেছনে ঘুরে থাকায় কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি। প্রথমে সামনে থাকা হেরে যাওয়া মোষ ধাক্কা দিয়ে তাঁকে মাটিতে ফেলে দেয়। তারপর জয়ী কাড়া তাঁর বুকের ওপর পা দিয়ে চলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে স্থানীয় পুরুলিয়া দু’ নম্বর ব্লকের কুস্তাউর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন।
[আরও পড়ুন: ‘কাছের মানুষ’, মালবাজার পৌঁছেই স্বজনহারা, বিপন্ন পরিবারগুলির কাছে ছুটে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী]
একমাত্র মেয়ে মালা বলছিলেন, “বাবা আমাকে সাইকেলের পিছনে, আমার ছোট ছেলেকে নিয়েছিলেন সামনে। হাতিমারা গ্রামের কাছে কাড়া লড়াই-র খবর পেয়ে ছেলে ও বাবা দাঁড়িয়ে যায়। দেখতে থাকে। আমার সাত বছরের ছোট ছেলে শৌচকর্ম করতে গেলে আমিও তার সঙ্গে যাই । আর সেই সময়ই এই ঘটনা ঘটে যায়। আমি এসে দেখি বাবাকে ঘিরে রয়েছে বহু মানুষ। বাবা কোন কথা বলছে না।” একমাত্র মেয়ে কথা বলতে বলতেই স্ত্রী করুনা বাউরির চোখে জল চলে আসে। বলতে থাকেন, “মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি থেকে আনতে গিয়ে এমন বিপদ ঘটে যাবে তা জানতাম না। না হলে মানুষটাকে ঘর থেকে বাইরে পাঠাতাম না।”
দিনমজুরি করে এই পরিবারের আয়। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে আগেই। দুই ছেলেও দিনমজুরের কাজ করেন । ছোট ছেলে বিবেক সুরাটে শ্রমিকের কাজ করে পরিবারের খরচ চালাতে সহায়তা করে। বড় ছেলে শ্যামাপদ সুরাটে গিয়েছিলেন। কিন্তু শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ায় পুজোর আগে আসেন। পরিবারের অন্যতম রোজগেরে সদস্য রথু মারা যাওয়ায় অর্থনৈতিক সমস্যাতেও পড়ল তারা। তাই গ্রামের মানুষ দাবি করেছেন, ওই আয়োজকদেরকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।