শুদ্ধশীল ঘোষ: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মনের আলমারিটা ভরতে শুরু করে। ছোটো থেকে মাঝারি বেলায় যে আনন্দ,যে স্মৃতি সেগুলোই বোধহয় আমাদের আজীবন বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। শরতের মেঘ ইতিউতি ভেসে বেড়ানো আর ঠাকুরবাড়ির বুড়ো শিউলিগাছটা জুড়ে ফুলের বহর দেখেই শুরু হত দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। স্কুল থেকে ফেরার সময় রোজ দেখতাম ধর্মতলার বারোয়ারী দুর্গামন্দিরে দুর্গা ঠাকুর কতটা হল।
খড় বেঁধে মাটির প্রলেপ দেওয়া, তারপর একে একে তৈরি হত মা দুগ্গার দশ হাত, হাতের আঙুল। পুজো এগিয়ে এলে মায়ের গায়ে রং লাগানো হত। তার পর মহালয়ার পর চক্ষুদান সব টুকুই স্কুল থেকে ফিরতি পথে দেখে নিতাম। আলাদাই একটা ভালো লাগা মিশে থাকত। দেখতাম কীভাবে একটা একটা করে দিন যায় আর উমা মহোৎসবের সাজে সেজে ওঠেন।
[আরও পড়ুন: ইজরায়েলের হয়ে হামাস নিধনে মণিপুরের যোদ্ধারা!]
এভাবেই পুজো আসত ছোটবেলায়। মনের আলমারির একটা পাশে খুব যত্ন করে সাজানো আছে স্কুলে শারদীয়া অনুষ্ঠানের সেই দিনগুলো। প্রতি বছর দুর্গাপুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই শুরু হত নাটকের মহড়া। বিবেকানন্দ স্কুলের তিনতলার হলঘরে শারদীয়া অনুষ্ঠানে এক এক বছর এক এক রকম নাটক মঞ্চস্থ হত। মহিষাসুরমর্দিনী থেকে শুরু করে দক্ষযজ্ঞে সতীর আত্মহুতি সব কিছুই নাটকের মধ্যে তুলে ধরা হত। প্রতি বছরই নাটকে অংশগ্রহণ করতাম। বেশির ভাগ সময় আমাকে দেবাদিদেব মহাদেবের অভিনয় করতে হত।
কী সুন্দর সময় ছিল! শারদীয়া অনুষ্ঠান দিয়েই ছুটি পড়ত দুর্গাপুজোর। তার পর বাড়ি ফিরেই স্কুলের ব্যাগ আর বইগুলোকে বেশ কিছুদিন বিশ্রাম দিতাম। সেই সময় আমাদের দুর্গাপুজোর অন্যতম আনন্দ ছিল ক্যাপ বন্দুক। পাড়ার দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল জুড়ে তখন শুধু ক্যাপ বন্দুক ফাটানোর আওয়াজ। খুব মনে পড়ে সমবয়সিদের মধ্যে সেই সময় ক্যাপ বন্দুক নিয়ে রীতিমতো সুপ্ত প্রতিযোগিতা চলত। কার বন্দুক কত বড় আর কার ক্যাপ কত জোরে ফাটে।
[আরও পড়ুন: ‘মিনি স্কার্টে উত্তেজক ভঙ্গির নাচ অশ্লীল নয়’, বলছে বম্বে হাই কোর্ট]
সারা পুজো জুড়ে পাড়ার অষ্টাজেঠুর মুদিখানার দোকান থেকে সিংহমার্কা ক্যাপের কতগুলো যে রিল কিনতাম তার হিসাব থাকত না। আরও স্মৃতি মনের আলমারি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার মধ্যে মা দুর্গার হাতের অস্ত্র নেওয়াটা ছিল অন্যতম। প্রতি বছর নিরঞ্জনের আগে মা দুর্গার হাত থেকে টিনের তৈরি অস্ত্রগুলোকে খুলে ফেলা হত। কে মায়ের হাতের খড়্গ টা বাড়ি নিয়ে যাবে সেই নিয়ে বায়না চলত। এখন অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে। সময় এগিয়েছে তার নিজস্ব গতিতে। ফেলে আসা স্কুলজীবনের সেই সময়গুলো, ছোটবেলার সেই সময়গুলো সত্যিই বড্ড আন্তরিক ছিল। সেই সময়ের ফ্লেভারটা আজ আর পাওয়া যায় না। স্কুলের শারদীয়া অনুষ্ঠান হোক কিংবা ক্যাপ বন্দুক, সব কিছুই এখন হারিয়ে গেছে। কিন্তু মনের সিন্দুকে সেগুলো তরতাজা।
তবে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আগেকার আনন্দ করার ধরনটাও অনেক পালটে গিয়েছে। কর্মব্যস্ততায় ভরা জীবনে সবাই-ই সময়নদীর স্রোতে নৌকা ভাসায়। আর যারা নদীর স্রোতে ভেসে না গিয়ে পাথরটা আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে তারাই থাকে আজীবন অন্তরে। ছোটবেলা থেকে মাঝারি বেলায় দুর্গাপুজোর এই স্মৃতিগুলোকে মনের আলমারি থেকে বের করে মাঝেমধ্যে নেড়েচেড়ে দেখার পর আবার মনের আলমারিতে সাজিয়ে রাখা দরকার।তবেই এই স্মৃতি আজীবন মনের কাছাকাছি থেকে যাবে।থেকে যাবে পুজোর সেই সোনালি দিনগুলো।