সৌমী গুপ্ত: মাঠের আলপথ জুড়ে কাশের বন মেঘের মতো ভিড় জমাত। বাতাসে পুজোর গন্ধ ছড়িয়ে যেত পুজো আসার অনেক আগে থেকেই। ভোরের দিকে শরতের প্রথম শিশির পড়তে শুরু করত। বেলা বাড়লে রোদ। গোটা পাড়ায় একটা মাত্র পুজো। ডাকের সাজ, সাবেকিয়ানায় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখতাম মাটির কাঠামো থেকে মা কেমন যেন দুগ্যি মা হয়ে উঠল!
সেই রথের মেলার দিন থেকে কাঠামোর গায়ে মাটি পড়ত। শেষ হত মহালয়া গড়িয়ে। মায়ের ছেলেপুলেরা এক এক করে তৈরি হয়ে যেত আমাদের চোখের সামনেই। বারোয়ারি তলায় হারানকাকা নিজে ঠাকুর বানাতেন। বৃষ্টিবাদলা মাথায় করে অবিশ্বাস্য অধ্যাবসায় সঙ্গী করে ঠাকুর গড়ে তাক লাগিয়ে দিতেন। আমরা ছোটবেলায় পুজো (Durga Puja 2023) মানে একটাই পুজো জানতাম। দুর্গাপুজো। বারোয়ারি তলার পাশে একটা পুকুর ছিল। সারা বছর সবুজ প্ল্যাঙ্কটন নিয়ে শুয়ে থাকলেও এই সময় শালুক আর পদ্মফুলে ভরে উঠত।
[আরও পড়ুন: সুইডেনে পড়তে গিয়ে প্রাণ গেল বাংলার তরুণীর, দেহ ফিরবে কীভাবে, জানেন না মা]
আমরা পাড়ায় সকলে হাত লাগাতাম পুজোর কাজে। মহালয়ার দিন বাবা অ্যালার্ম দিয়ে রাখলেও আমরা সেদিন উঠে পড়তাম নিজে থেকেই। দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতাম রেডিওর সেই নস্টালজিক সুর,’আশ্বিনের শারদ প্রাতে…’ বা ‘বাজল তোমার আলোর বেনু…’ সকাল থেকে সংস্কৃত মন্ত্র! আমাদের ঘুমচোখেও জল চলে আসত। আবেগে, আনন্দে! এই কটা দিন শুধু হইহুল্লোড়, টো টো করে ঘোরা, বারোয়ারি তলায় পুজোমণ্ডপে দেদার আড্ডা!
বাবা একদিন বসতেন। লম্বা ফর্দ বানাতেন। বাড়ির সহযোগী দিদি, তার মেয়ে, চণ্ডীতলার লালপেড়ে শাড়ি, আলতা, সিঁদুর, মা দুর্গার লাল পাড় সাদা শাড়ি কিচ্ছু বাদ যেত না। পড়ায় মন বসত না শেষ অপেক্ষার দিনগুলো। কান খাড়া করে শুনতাম বাড়ির আলোচনা। মা বলতেন,”মুদির দোকানে এবার একটু বেশি করে ঘি নিও। পোলাও হবে, খিচুড়ি হবে! বাড়িতে লোকজন আসবে। কম যেন না পড়ে।”
[আরও পড়ুন: বিরাটের রেকর্ড ভেঙেও বোলারদের প্রশংসায় মজে নির্লিপ্ত রোহিত]
তার পর রান্নাঘর ঘষে মেজে, উনুনে গঙ্গাজল ছিটিয়ে নাড়ু বানানো হত। সারা ঘর নাড়ুর গন্ধে ম ম করত। উঠোনে রোদে দেওয়া জামাকাপড় তুলতে তুলতে মা বলতেন,”সবুর কর বাপু! ঠাকুরের জন্য তুলে রেখে দিচ্ছি!” একটা তিনকোনা ঝাপসা রোদ বেয়ে আসত জানালা দিয়ে পড়ন্ত বিকেলে। পুকুরে জলের ভাঁজ পড়ত। তরতর করে বেলাটা ওই পুকুরের ওপারের অদৃশ্য সিঁড়ি বেয়ে চলে যেত কোথায়! আমার বিছানাময় তখন পুজোবার্ষিকী!
একটু বড় হলাম যখন, তখন পুজো মানে প্রেম। অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলির সময় তাকে ধুতি-পাঞ্জাবিতে দেখা, চোখে চোখে কথা! দশমীতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা! নবমী নিশি শেষ হওয়ার আগেই বলবে তো! এ এক অদ্ভুত আনচান! সপ্তমী থেকে অষ্টমী হয়ে দশমী- খাওয়াদাওয়া কিন্তু একসঙ্গে। ভোগের খিচুড়ি, পাঁঠার মাংস, রুই কালিয়া এসব আমাদের অপরিহার্য পুজোর মেনু। ঢাক বাজতে বাজতে কখন যে দশমী চলে আসত টের পেতাম না। একটা হু হু করা বিকেল, বিষন্ন হেমন্তের দশমীর সন্ধে আসত আমরা সিঁদুর খেলায় যোগ দিতাম! ব্যাকগ্রাউন্ডে কত যে গান! সকাল থেকে শ্রীকান্ত আচার্যের খোলা জানালা থেকে শুরু করে নচিকেতার নীলাঞ্জনা এবং শেষ বিকেলে কুমার শানু ‘তু প্যায়ার হ্যা কিসি অউর কা’ পাড়ার ভোলেভালা বলাইদাকেও প্রেমে ফেলতে বাধ্য করত।
শহরে এখন হোর্ডিংয়ের ছড়াছড়ি,আলোর রোশনাই! আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলার দুর্গাপুজো খুঁজে বেড়াই প্রতি বছর! পাই না! যা চলে যায় তা ফেরত আসে না! এই আতিশয্য, অভিজাতময় পুজোর মধ্যেও আমার ছোটবেলার সেই মায়াময় দুগ্গাপুজোর দিনগুলো মনে পড়ে, মনে পড়বেই।