Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ৫ জুন ২০২৬
Atal Bihari Vajpayee

প্রকাশ্যেই স্মরণ করান ‘রাজধর্ম’, মরিয়া চেষ্টাতেও মোদিকে সরাতে পারেননি বাজপেয়ী! কেন?

হয় মোদি নয় আমি, 'অবাধ্য শিষ্যকে' সরাতে ইস্তফা পর্যন্ত দিতে গিয়েছিলেন বাজপেয়ী।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২০, ২০২৪, ২০:০৭

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২০, ২০২৪, ২০:০৭

options
link
প্রকাশ্যেই স্মরণ করান ‘রাজধর্ম’, মরিয়া চেষ্টাতেও মোদিকে সরাতে পারেননি বাজপেয়ী! কেন? zoom

লোকসভা নির্বাচনকে ঘিরে নানা কিসসা-কাহিনি পর্বে পর্বে সংবাদ প্রতিদিন ডট ইনে। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর ‘মৃত্যুরহস্য’ থেকে ইন্দিরা গান্ধীর ‘জেলযাত্রা’, জ্যোতি বসুর ‘ঐতিহাসিক ভুল’ থেকে মোদির ‘রাজধর্ম পালন’- ফিরে দেখা হারানো সময়। লিখছেন বিশ্বদীপ দে

”মুখ্যমন্ত্রীর জন্য আমার একটাই বার্তা। উনি রাজধর্মের পালন করুন।… আমি সেটাই পালন করি। পালন করার চেষ্টা করি। রাজার কাছে প্রজায় প্রজায় ভেদাভেদ হয় না। জন্ম, জাতি কিংবা সম্প্রদায়, কোনও কিছুর ভিত্তিতেই শাসক প্রজায় প্রজায় বিভেদ করতে পারে না।”

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'নজরে নবান্ন' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

”আমিও তাই করছি সাহেব।”

”আমার বিশ্বাস, নরেন্দ্র ভাই সেটাই করছেন।”

ভারতীয় রাজনীতি বহু অবিস্মরণীয় দৃশ্যের সাক্ষী। গত সাড়ে সাত দশকে বহু রাজনৈতিক ও নাটকীয় সংঘাতের সাক্ষী হয়েছে এদেশের আমজনতা। কোনও সন্দেহ নেই, সেই সব দৃশ্যের ভিড়ে অমলিন হয়ে রয়েছে ২০০২ সালের একটি দৃশ্য। যে দৃশ্যের দুই পাত্র অটলবিহারী বাজপেয়ী ও নরেন্দ্র মোদি। গুজরাট দাঙ্গা এদেশের বুকে এক এমন অধ্যায়, যে ক্ষত আজও শুকোয়নি বুঝি। নতুন সহস্রাব্দ তখন সবে শুরু হয়েছে। সেই সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee)। আর গুজরাটের (Gujarat) মুখ্যমন্ত্রী মোদি (PM Modi)। দাঙ্গার মাসখানেক পরে সেই রাজ্যে গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। আর সেখানেই সাংবাদিক সম্মেলনে বাজপেয়ী ও মোদির এই কথোপকথন আজও ফিরে ফিরে আসে। যে দাঙ্গার রেশ ২০০৪ সালে বিজেপির ভরাডুবির সময়ও বোধহয় ছিল। গেরুয়া শিবিরের ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’ স্লোগানেও সম্ভবত চাপা পড়েনি সেই বিতর্ক। নির্বাচনে হারের পর তা ফের ফিরে এসেছিল। শেষপর্যন্ত বাজপেয়ী যুগের অবসান ও মোদি যুগের সূচনা হয়েছিল সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে। এই পালাবদলের এক গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হয়ে থেকে গিয়েছে ‘রাজধর্ম’।

[আরও পড়ুন: জেলে কেজরিওয়ালকে ধীরে ধীরে হত্যার চেষ্টা! বিস্ফোরক অভিযোগ আপের]

গুজরাট দাঙ্গার সময় কেন্দ্রের এনডিএ সরকারে বিজেপি ছাড়াও জোটসঙ্গী দলগুলির ৭৪ জন সাংসদ ছিলেন। বেশির ভাগই নীরব ছিলেন দাঙ্গা বিষয়ে। একমাত্র রামবিলাস পাসোয়ান পদত্যাগ করেন গুজরাট দাঙ্গার মাস দুয়েক পরে। আবার বাইরে থেকে এনডিএকে সমর্থন করতে থাকা চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপিও দাবি তুলতে শুরু করেছিল গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরানো হোক মোদিকে। যদিও নীতীশ কুমারের মতো জোটসঙ্গী নেতা মন্ত্রিত্ব তো ছাড়েনইনি, বরং তাঁর মুখে শোনা যাচ্ছিল মোদির ভূয়সী প্রশংসা। কিন্তু খোদ প্রধানমন্ত্রী? তিনি কী ভাবছিলেন? বাজপেয়ীর অনুগতদের দাবি, সেই সময় মোদির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন বাজপেয়ী। কিন্তু দল যে এই ইস্যুতে তাঁর পাশে নেই, এটাও তিনি বুঝতে পারছিলেন। আসলে মোদিকে কেন্দ্র করে তখন বাজপেয়ী ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এল কে আডবাণী যেন দুই শিবিরে। আডবাণী তাঁর ‘মাই কান্ট্রি মাই লাইফ’ বইয়ে ‘সাম ডিফারেন্সেস’ অংশে পরিষ্কার লেখেন তাঁর সঙ্গে বাজপেয়ীর মতান্তর ছিল।

[আরও পড়ুন: দূরদর্শনের গৈরিকীকরণ! লোগো বিতর্কে মুখ খুললেন প্রসার ভারতীর প্রধান]

পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় বাজপেয়ী ঠিক করেন মোদি যেহেতু ইস্তফা দিচ্ছে না, তিনিই পদত্যাগ করবেন। সেই সময় দেশের অর্থমন্ত্রী ছিলেন যশবন্ত সিং। একদিন তাঁকে ফোন করেন টেলি যোগাযোগ মন্ত্রী প্রমোদ মহাজন। বলেন, দ্রুত সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে চলে আসতে। সেখানে বসে তখন নিজের ইস্তফাপত্র লিখতে শুরু করেছেন অভিমানী বাজপেয়ী! সেযাত্রায় বাজপেয়ীকে নিরস্ত করেন যশবন্ত ও প্রমোদ। বিশেষ করে যশবন্ত। তিনি চেপে ধরেছিলেন বাজপেয়ীর হাত। তাতে বিরক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। তবে শেষপর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। ইস্তফা দেননি। কিন্তু মনের ভিতরে থাকা ক্ষোভও প্রশমিত হয়নি তা বলে। বাজপেয়ী পরে আডবাণীকে নাকি বলেছিলেন, মোদির অন্তত ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা উচিত ছিল।

গোয়ায় বিজেপির কার্যকারিণী সভায় যোগ দিতে যাচ্ছিলেন চার নেতা। বিমানে মুখোমুখি বসেছিলেন বাজপেয়ী ও আডবাণী। তাঁরা ছাড়াও সেখানে ছিলেন যশবন্ত সিং, অরুণ শৌরী। পরবর্তী কালে অরুণ দাবি করেছিলেন, সেদিন বাজপেয়ী ও আডবাণী কেউই কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন না। মাঝ আকাশে খবরের কাগজ মুখে নিয়ে নীরবতাকে সঙ্গী করাই শ্রেয় মনে করেছিলেন দুজন। শেষপর্যন্ত অরুণই বাজপেয়ীর হাত থেকে কাগজ সরিয়ে নেন। তাঁকে কথা বলতে বলেন মোদির বিষয়ে। এর পরই নাকি মোদির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজপেয়ী আলোচনা করতে থাকেন। আডবাণীর পরিষ্কার দাবি ছিল, মোদির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করলে বিজেপির মধ্যে অন্তর্কলহ শুরু হয়ে যাবে। তাঁর কথায়, ”বাওয়াল খাড়া হো জায়েগা পার্টি মে।”

‘লৌহপুরুষ’ যে ভুল বলেননি, তা স্পষ্ট হয় গোয়ায়। সেবারের সভায় সকলের নজরই ছিল মোদির দিকে। কিন্তু সভায় গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হাসতে হাসতেই প্রবেশ করেন। বাজপেয়ী তাঁর দীর্ঘ ভাষণে গুজরাট দাঙ্গা ও গোধরা কাণ্ড নিয়ে অনেক কিছু বলেছিলেন। পরে মোদি তাঁর ইস্তফাপত্র পেশও করে দেন। আর তার পরই শুরু হয়ে যায় শোরগোল। সভার একটা বড় অংশ চিৎকার করে স্লোগান দিতে থাকেন, ‘ইস্তফা মত দো!’ সেই দলে কেশুভাই প্যাটেল ও প্রমোদ মহাজনের মতো বাজপেয়ী-ঘনিষ্ঠরাও ছিলেন। যা দেখে কার্যতই হতভম্ব হয়ে যান মঞ্চে বসে থাকা বাজপেয়ী। মনে করা হয়, তিনি সেদিনই বুঝে গিয়েছিলেন আরএসএসের সঙ্গে মোদির ঘনিষ্ঠতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এখানে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। বাজপেয়ী যখন মোদির ইস্তফা চাইছিলেন, সেই সময় তিনিই দেশের প্রধানমন্ত্রী। রাজনৈতিক প্রতিপত্তিতে মোদির থেকে ঢের আগে থাকা দেশের কুরসিতে উপবিষ্ট এক মানুষ কেন পারলেন না তুলনায় অনেক কম প্রভাবশালী মোদিকে সরিয়ে দিতে? ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ মনে করেন, এর পিছনে ছিল বাজপেয়ীর মধ্যপন্থা। অনেক ইস্যুতেই তিনি এগিয়েও যেন পুরোপুরি এগোতে চাইতেন না। যে সময় গোয়ায় তিনি মোদিকে সরাতে বদ্ধপরিকর, সেই সময় সেখানেই এক জনসভায় মোদির সপক্ষে কথা বলতে শোনা গিয়েছিল তাঁকে।

যাই হোক, সেবছরের শেষে বিধানসভা নির্বাচন হয় গুজরাটে। আশঙ্কা ছিল, দাঙ্গা পরবর্তী সময়ে হয়তো হালে পানি পাবেন না মোদি। কিন্তু কোথায় কী! ১৮২ আসনের মধ্যে ১২৭টিতে জয়লাভ করে গেরুয়া শিবির। ৪৯.৮৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল তারা। ৩৯.৫৫ শতাংশ ভোট পেয়েও কংগ্রেস মাত্র ৫১টি আসনে জয়লাভ করে। নতুন করে মসনদে ফিরেই ‘ব্র্যান্ড মোদি’কে মজবুত করার কাজ শুরু করে দেন নরেন্দ্র মোদি। তাঁকে দেখা যায় বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সক্রিয় হয়ে উঠতে। বলা হয়, ততদিনে আরএসএসের আরও আস্থাভাজন হয়ে উঠেছেন তিনি। একদিন যে এদেশের কুরসিতে তাঁকে বসতে দেখা যেতে পারে, সেই সম্ভাবনা বোধহয় ধীরে ধীরে তৈরি হতে শুরু করে এই সময় থেকেই।

২০০৪ সালে বিজেপির হার অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। কেননা তার আগে হওয়া মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও রাজস্থানের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল গেরুয়া শিবির। ফলে ‘ইন্ডিয়া শাইনিং’ স্লোগান সামনে রেখে পোখরান, কার্গিল ইস্যু সাজিয়ে প্রচারে শান দিচ্ছিল গেরুয়া শিবির। আর সেই প্রচারের মুখ ছিলেন বাজপেয়ীই। কিন্তু লাভ হল না। নির্বাচনের ভরাডুবি হল।

এর পরই এক বিস্ফোরণ ঘটালেন বাজপেয়ী। তিনি সাংবাদিকদের বলে বসলেন, ”২০০৪ লোকসভা নির্বাচনে হারের একটা কারণ গুজরাট দাঙ্গা হতেই পারে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে চেয়েছিলাম মোদিকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরাতে।” তাঁর এমন কথা মোটেই মানতে চায়নি আরএসএস। তাদের যুক্তি ছিল, যদি দাঙ্গা ফ্যাক্টরই হত তাহলে রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও মধ্যপ্রদেশে জয় এল কোন শর্তে। অর্থাৎ বিষয়টা আরও সরাসরি ভাবে আরএসএস বনাম বাজপেয়ী হয়ে উঠেছিল।

বাজপেয়ীর দাবি ছিল, দলে ফের আলোচনা করা হবে গুজরাট দাঙ্গা ও মোদির বিষয়ে। কিন্তু বিজেপির তৎকালীন জাতীয় সভাপতি ভেঙ্কাইয়া নাইডু সেই দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, গুজরাট দাঙ্গা এখন এক ‘ক্লোজড চ্যাপ্টার’। কিন্তু বাজপেয়ীই ফের দাবি করতে থাকেন, কথাটা ঠিক নয়। এই বিষয়ে আলোচনা হবে দলের অভ্যন্তরে। স্বাভাবিক ভাবেই এই পরিস্থিতিতে অস্বস্তি বাড়ছিল। এই সময় বাজপেয়ী ছিলেন মানালিতে। কিন্তু তিনি সেখান থেকে দিল্লি ফেরার পর দেখা যায়, তাঁর শরীরী ভাষা বদলে গিয়েছে। ক্রমে তিনি এও বলতে থাকেন, মোদিকে সরানোর ইস্যু এখন অতীত হয়ে গিয়েছে। সেবছরের জুনে মুম্বইয়ে হওয়া কার্যকারিণী সভা বুঝিয়ে দেয়, দিন বদলে গিয়েছে। বাজপেয়ী এখন এক অস্তগামী সূর্য। এবার তাঁর যুগের শেষ। আর তাঁকে সরিয়ে দেশজুড়ে বিজেপি তথা হিন্দুত্বের মুখ এখন নরেন্দ্র মোদি। বছর দশেক বাদে, দুই ইউপিএ সরকারের অবসানে তিনিই বসবেন ‘তখত-এ-হিন্দুস্তান’-এ।

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'নজরে নবান্ন' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.