সুরজিৎ দেব, ডায়মন্ড হারবার: পুরাণে কথিত বানাই নদী আজ আর নেই। যদিও কোথাও-কোথাও বয়ে যাওয়া এক চিলতে স্রোত আজও সাক্ষ্য বহন করে চলেছে সেই প্রাচীন ইতিহাসের। দক্ষিণ ২৪ পরগনার উস্তি থানার একতারা পঞ্চায়েতের সরবেড়িয়া গ্রামে ঘুঘুরবনের জঙ্গলই নাকি ছিল বানাইয়ের তীর। পরবর্তীতে সেখানে তৈরি হয়েছে জনপদ, শ্মশান। ৮০ বছর ধরে সেই শ্মশানেই পূজিতা হচ্ছেন শ্মশানকালী। স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন, এখানকার দেবী জাগ্রত।
কথিত আছে, পুরাণ যুগে এই বানাই নদীর ধারেই গড়ে উঠেছিল শিবের উপাসক বান রাজার সাম্রাজ্য। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক দেবীশংকর মিদ্দা জানান, পুরাণের কথা অনুযায়ী, কৃষ্ণের পৌত্র অনিরুদ্ধ প্রেমে পড়েন বান রাজার কন্যা ঊষার। তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন। এরপর অনিরুদ্ধ নাকি আর ঊষাকে বিয়ে করতে রাজি হননি। ক্ষোভে অনিরুদ্ধকে আটক করেন বানরাজ। স্নেহের পৌত্রকে ছাড়িয়ে আনতে বান রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন কৃষ্ণ। যুদ্ধে বান রাজাকে পরাস্ত করেন কৃষ্ণ ও পরে তাঁকে হত্যা করা হয়। বলা হয়, দুপক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল তৎকালীন বানাই নদীর তীরেই। কালের যাত্রায় সেই বানাইয়ের অস্তিত্ব আজ আর প্রায় নেই বললেই চলে। এখনও সেখানে খুঁজলে মেলে সেই যুগের নানা প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান।
[আরও পড়ুন: ICC World Cup 2023: নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে এই ৪ রেকর্ডে নজর রোহিত-বিরাটদের]
একসময় ওই এলাকা ঢেকে যায় ঘন জঙ্গলে। জঙ্গলের পাশ দিয়ে নদীপথে নৌকায় ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। সেই সময় সেখানে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের উপদ্রব বাড়ে। দস্যু উপদ্রবে যে সামান্য জনপদটুকু ছিল তাও ক্রমেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পরবর্তীকালে জঙ্গল আরও ঘন হয়। কথিত আছে, সেই জঙ্গলে বসেই তন্ত্রসাধনা করতেন কাপালিকরা। একসময় জঙ্গল কেটে সেখানে গড়ে ওঠে জনপদ, শ্মশান। জঙ্গল কেটে সাফ হলেও ওই এলাকা ঘুঘুরবন বা নাপতিনির চর নামে পরিচিত আজও। জনশ্রুতি রয়েছে, একদিন শ্মশানে ঢুকে একটি খেঁজুর গাছের গায়ে কালীমূর্তির প্রতিচ্ছবি দেখতে পান স্থানীয় লোকজব। পরে তাঁদেরই একজন স্বপ্নাদেশ পান, শ্মশানে দেবীর পুজোর আয়োজন করার। সালটা ছিল ১৯৪৩। তখন থেকেই শ্মশানকালীর পুজোর সূচনা হয়।
পুজো কমিটির সম্পাদক বুবাই কোলে জানান, দেবী এখানে পূজিতা হন শৈব শাক্ত মতে। চলে তন্ত্রসাধনাও। সারা বছরই শনি ও মঙ্গলবার দেবীর পুজো হয়। শ্যামাপুজো উপলক্ষে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন তাঁদের মনষ্কামনা পূরণের আশায়। মানত করে তাঁরা তাঁদের ভক্তির ডালি নিবেদন করেন শ্মশানকালীকে। তাঁদের রাত্রিযাপনের জন্য পুজো কমিটির পক্ষ থেকে আশ্রয় শিবিরেরও ব্যবস্থা করা হয়।