সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: অযোধ্যায় মন্দির–মসজিদ বিতর্কে ইতি টেনে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের রায়। কিন্তু বিতর্ক যেন শেষ হয়েও হচ্ছে না। এবার উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার সঙ্গে পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়কে এক আসনে বসিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো। কেন্দ্রের পর্যটন মন্ত্রীকে দেওয়া একটি চিঠিতে পুরুলিয়ার সাংসদ লিখেছেন, রাম–সীতা বনবাসে থাকার সময় এই পাহাড়ে এসেছিলেন। সেই সময় সীতাদেবী তৃষ্ণার্ত হওয়ায় ওই অযোধ্যা ভূমে তির নিক্ষেপ করে জল বার করেন। সেই জল পান করেন সীতাদেবী। তাই পাহাড়ের একটি এলাকার নাম – সীতাকুণ্ড।
সাংসদের এমন আজব দাবির কড়া সমালোচনা করেছেন রামায়ণ বিশেষজ্ঞ থেকে পুরুলিয়ার ইতিহাস গবেষকরা। সেইসঙ্গে রাজনৈতিক মহলেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রী প্রহ্লাদ সিং প্যাটেলকে দেওয়া সাংসদের ওই চিঠি ভাইরাল সোশ্যাল সাইটে। হিন্দিতে দেওয়া রাম–সীতার বিষয়ে ওই চিঠিতে লেখা, “অযোধ্যা পর্যটকস্থল ঐতিহাসিক ইস কারণ সে হ্যায় কি ভগবান শ্রীরামজি অপনে বনবাস কে দৌরান ইঁহা পর আয়ে থে তথা মাতা সীতাজি কি জব পিয়াস লগি থি শ্রীরামজি নে অপনে বানসে ধরতি মে মারা অউর পানি নিকলা তথা মাতা সীতানে অপনি পিয়াস বুঝাই। উও স্থান আজ ভি অযোধ্যা হিল পর মওজুদ হ্যায়, জো সীতাকুণ্ড কে নাম সে জানা জাতা হ্যায়।” সম্প্রতি পুরুলিয়ায় দলীয় বৈঠকে গিয়ে মুকুল রায় সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতোকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, অযোধ্যা পাহাড়ে পর্যটন নিয়ে কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করার। তার পরিপ্রেক্ষিতেই সাংসদের এই চিঠি, যা নিয়ে এখন জোর চর্চা চলছে।

ওই চিঠিতে বিজেপি সাংসদ অযোধ্যা পাহাড়ের পর্যটনের বিষয়ে শাসকদল তৃণমূলকেও আক্রমণ করেন। তিনি চিঠিতে লিখেছেন, তাঁর কেন্দ্র তথা পুরুলিয়ার উন্নয়নে তৃণমূল সরকার উদাসীন। এদিকে, রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন বিভাগের আওতায় থাকা সামগ্রিক অঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদ সীতাকুণ্ডকে নিজেদের পর্যটন প্রচারপত্রে ‘Autoflow specially for students of Anthropology’ বলে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ যাকে বিজ্ঞান নির্ভর পড়াশোনার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে কীভাবে পৌরাণিক ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, এই প্রশ্নও উঠছে।
পুরুলিয়া জেলা তৃণমূলের সহ–সভাপতি তথা পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সাংসদ অযোধ্যা পাহাড়কে ‘ঐতিহাসিক স্থান’ বলায় আমরা ভীষণই খুশি। কিন্তু উনি এই পাহাড়ের লোককথার ইতিহাসের সঙ্গে পৌরাণিক কাহিনি মিশিয়ে দিতে চাইছেন। ইতিহাসের স্থান আলাদা। পৌরাণিক স্থল আলাদা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঢালাও উন্নয়নের জন্যই আজ অযোধ্যা পাহাড় রাজ্যের প্রথম সারির পর্যটনস্থলের মধ্যে একটি। তাই পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রের কাছ থেকে টাকা আনতে রাম–সীতাকে টেনে আনার প্রয়োজন নেই। তাঁরা আসলে পুরাণ ও ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্যটুকুই বোঝেন না।”
[আরও পড়ুন: ৭ আবাসিকের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় হোম কর্তাকে শো-কজ পুরুলিয়া প্রশাসনের]
পুরুলিয়ার সাংসদের এই দাবিতে ইতিহাস গবেষকরা বলছেন, পৌরাণিক কাহিনীকে ইতিহাসের উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই জেলার ইতিহাস গবেষক দিলীপ গোস্বামী বলেন, “অযোধ্যা পাহাড়ে নাকি এখনও সীতার চুল পাওয়া যায়। এসবই কল্পকাহিনী। তাকে ইতিহাসের উপাদান হিসাবে ব্যবহার করা একেবারে ঠিক নয়, বিপজ্জনকও বটে।” আদিবাসী লোকসংস্কৃতি গবেষক জলধর কর্মকারের কথায়, “হিমালয় যখন সৃষ্টি হয়নি, তখন এখানে যাযাবরের মত বিরহোড় জনজাতি ঘুরে বেড়াত। তারপর ভূমিজ ও সাঁওতালরা এখানে আসেন। তাই এই ভূমি আদিবাসীদের। তাঁরা সকলেই মূর্তি পূজার বিরোধী। তাই এই পাহাড়ে রাম–সীতার গল্পের সঙ্গে প্রাচীন জনজাতির সংস্কৃতির কোনও মিল নেই। তাই সাঁওতালি ভাষায় অযোধ্যা পাহাড়কে ‘আয়োদিয়া’ বলে। যার অর্থ, অযোধ্যা মা সকলকে অতিথিশালার মত এই পাহাড়ে আশ্রয় দিয়েছেন। অযোধ্যা সিং বলে এখানে একজন ভূমিজ জমিদার ছিলেন, যার নামকরণেই পরে অযোধ্যা পাহাড়ের পরিচিতি হয় বলে কথিত আছে।”
শহরের রাঁচি রোডের বাসিন্দা পণ্ডিত সুবোধ পাঠক নিয়মিত রামায়ণ পাঠ করেন। তিনি বলছেন, “আমি নিয়মিত তুলসীদাসের ‘রামচরিত মানস’ পাঠ করি। কিন্তু সেখানে কোথাও পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের উল্লেখ নেই। এমনকী বাল্মীকির রামায়ণে সাত কাণ্ডে মধ্যে একটি সুন্দরাকাণ্ডেও এই অযোধ্যার কথা পাইনি।” কেবল বিজেপি সাংসদই যে কোন গ্রন্থ ঘেঁটে এমন অযোধ্যা পাহাড়ের এমন এক প্রেক্ষাপট আবিষ্কার করলেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।