Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৪ জুন ২০২৬
Tariff War

নখদাঁত বের করেছেন ট্রাম্প! শুল্কযুদ্ধে কী অবস্থান ভারতের?

২০১৮ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে ভারতের রপ্তানি।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: মার্চ ৩, ২০২৫, ২১:২৬

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: মার্চ ৩, ২০২৫, ২১:২৬

options
link
নখদাঁত বের করেছেন ট্রাম্প! শুল্কযুদ্ধে কী অবস্থান ভারতের? zoom

শুল্ক-সংক্রান্ত ডামাডোলে ট্রাম্পের নজর সেসব দেশের দিকে, যারা আমেরিকার বিরুদ্ধে লেনদেন ব্যালান্সে উদ্বৃত্ত ভোগ করে। ভারতও আছে সে-তালিকায়। কিন্তু ২০১৮ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে ভারতের রপ্তানি। বিদেশি মুদ্রার উপার্জন বাড়ছে–তাই ভারত এই ‘বাজার’ হারাতে চায় না। লিখছেন গৌতম সরকার

১৮৬১ সালের ২ মার্চ, তদানীন্তন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জেমস বুচাননের আমলে,
একটি আমদানি শুল্ক চাপানো হয়, যার নাম জাস্টিন স্মিথ মরিলের নামানুসারে দেওয়া
হয়েছিল ‘মরিল ট্যারিফ’। জাস্টিন মরিল ছিলেন এই করের পৃষ্ঠপোষক এবং তিনি এই
করের ধারণা অর্থনীতিবিদ হেনরি চার্লস ক্যারি-র থেকে পেয়েছিলেন। এই ‘আমদানি শুল্ক’ আরোপ করার কারণ হিসাবে দেশীয় শিল্পায়নে জোর দেওয়ার কথা বলা হলেও– সেই প্রাপ্ত অতিরিক্ত রাজস্ব– তদানীন্তন মার্কিন সরকারকে দিন-দিন বাড়তে থাকা ফেডারেল ঘাটতি মেটাতে, এবং শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে সাহায্য করেছিল।

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'নজরে নবান্ন' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

তারপর মিসৌরি-মিসিসিপি দিয়ে লক্ষ-লক্ষ কিউসেক জল বয়ে গিয়েছে। আমেরিকা-সহ সারা বিশ্ব খোলাবাজারি অর্থনীতি, বিশ্বায়ন, উদারীকরণ, বেসরকারিকরণের চমক দেখেছে। এর কয়েক দশক পর সহসা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অর্থনৈতিক সংস্কার ও মুক্ত বাণিজ্যে বীতরাগ সৃষ্টি হয়েছে– এবং সাম্প্রতিক পৃথিবীব্যাপী ‘শুল্ক যুদ্ধ’-র যে-আগুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন, সেটা তারই প্রকাশ।

ভাবলে ভুল হবে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই ‘মুক্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য’ নিয়ে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করেছিলেন। বহু আগে, যখন তিনি রাজনীতিতে আসেননি, দুনিয়াব্যাপী রিয়েল এস্টেটের একজন মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন, তখন থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন– আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একটি দেশকে ধনী নয়, দরিদ্র করে তোলে। সেই দেশের উৎপাদন, চাকরি, বিনিয়োগ ও ভোগ অন্য দেশে চালিত করে আখেরে দেশটির জিডিপি, কর্মসংস্থান, মূলধন গঠন ইত্যাদিতে ভাগ বসায়। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনী প্রচারে তিনি বারংবার বিদেশি পণ্যের উপর ‘ইমপোর্ট ট্যারিফ’ বসিয়ে দেশীয় শিল্পের প্রসার এবং চাকরির ক্ষেত্রে মার্কিনি ভূমিপুত্রদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

হোয়াইট হাউস পুনর্দখলের সূচনা লগ্নেই ট্রাম্প তিন বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী দেশের পণ্যে নয়া আমদানি শুল্ক জারি করেছেন। চিন থেকে আসা সমস্ত পণ্যে ১০ শতাংশ এবং কানাডা ও মেক্সিকোর পণ্যে ২৫ শতাংশ করে শুল্ক জারির কথা ঘোষণা হয়েছে। এই তিনটি দেশেকে ‘আলাদা’ করে বেছে নেওয়ার কারণ রূপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, চিনে তৈরি বহু ওষুধ মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে আমেরিকায় ঢুকলেও, বেজিং এবং মেক্সিকো সিটিকে বারংবার বলা সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ না করে দর্শকের ভূমিকায় থেকেছে তারা।

অন্যদিকে, মেক্সিকো ও কানাডা দুই সীমান্ত পথেই বহু ‘অবৈধ’ অভিবাসী আমেরিকায় প্রবেশ করে। যদিও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেইনবাউম পার্দো-র তরফে সীমান্ত নিরাপত্তার ব্যাপারে যথোপযুক্ত নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় আপাতত এই দুই দেশের উপর ধার্য আমদানি শুল্ক এক মাসের জন্য মুলতবি রাখা হয়েছে। এছাড়া আরও এক হুঁশিয়ারিতে প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন– ভারত, চিন, রাশিয়া-সহ ব্রিকস গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলো যদি ডলারের পরিবর্তে ‘ব্রিকস কারেন্সি’ চালু করে, তাহলে ওসব দেশের পণ্যে তিনি ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন। চিন তিন দিনের মধ্যে পাল্টা চাল দিয়েছে।

ট্যারিফের বদলা ট্যারিফ নীতি অবলম্বন করে তারা আমেরিকার পণ্যের উপর ১০-১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করেছে। বলা বাহুল্য, বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশগুলির এরকম আচমকা ‘শুল্ক যুদ্ধ’ বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য টলিয়ে দিয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব থেকে কোনও দেশই নিজেকে বঁাচাতে পারবে না। ভারত ইতিমধ্যেই এই শুল্ক যুদ্ধের অন্যতম শরিক হয়ে ওঠার সিঁদুরে মেঘ দেখতে পেয়ে চিন্তায়।

কিছু দিন আগে ট্রাম্প ভারতকে তঁার দেশ থেকে আরও বেশি পরিমাণে অস্ত্র কেনার জন্য একপ্রকার চাপ সৃষ্টি করেন বলে খবর। আমদানি-রফতানি লেনদেনে ভারসাম্য রক্ষার কথা বলেছেন। মনে রাখতে হবে, তঁার প্রথম মেয়াদকালে ট্রাম্প ভারতের রফতানির উপর চড়া হারে শুল্ক আরোপ করেছিলেন। উল্টে আমেরিকা থেকে আসা বিলাসদ্রব্য– যেমন, হার্লে ডেভিডসন মোটর বাইকের উপর ভারত সরকারের আরোপিত উচ্চহার করের তীব্র নিন্দা করেছিলেন। ‘শুল্কের রাজা’ অভিহিত করে ভারত যে অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলনের মধ্য দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অপব্যবহার করছে– সেই অভিযোগও করেছেন ট্রাম্প। দ্বিতীয়বার মসনদে বসার আগেই তিনি হুমকির সুরে জানিয়েছিলেন, ভারতের মতো দেশের উপর ২০ শতাংশ এবং চিনজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে সর্বাধিক ৬০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করতে চান। স্বাভাবিকভাবেই এই মুহূর্তে একটি প্রশ্ন ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে– এই শুল্ক যুদ্ধ ভারতকে কতটা প্রভাবিত করবে?

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গুড বুক’-এ থাকার অভিপ্রায়ে ভারত গত সপ্তাহে ১,৬০০ সিসি-র অধিক ইঞ্জিনের হেভিওয়েট মোটরসাইকেলের উপর আমদানি শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশ করেছে। এছাড়া কম-শক্তিসম্পন্ন ইঞ্জিনের ছোট মোটরসাইকেলের শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪০ শতাংশ করেছে। এর মাধ্যমে ভারত মার্কিন প্রেসিডেন্টের গোঁসা কমানোর চেষ্টার পাশাপাশি ট্াম্পের সাম্প্রতিক শুল্ক যুদ্ধে অন্যতম শরিক না-হয়ে পড়ার এক মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।

শুল্ক-সংক্রান্ত এই ডামাডোলে ট্রাম্পের নজর সেসব দেশের দিকে, যারা আমেরিকার বিরুদ্ধে লেনদেন ব্যালান্সে উদ্বৃত্ত ভোগ করে। ভারতও সে-তালিকায় রয়েছে। ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষে দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যের (রফতানি ও আমদানি) পরিমাণ ছিল ১৯০ বিলিয়ন ডলার।
সেই অর্থবর্ষে ভারতের উদ্বৃত্ত ছিল ৩৬.৭৪ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ক্রমাগত বেড়ে চলেছে ভারতের। বিদেশি মুদ্রার উপার্জন বাড়ছে– তাই কেন্দ্রীয় সরকার কোনও মূল্যেই এই ‘বাজার’ হারাতে চায় না। ফলে ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য একের-পর-এক সুবিধা দিয়ে চলেছে। মোটরসাইকেলের সঙ্গে ভারত একাধিক পণ্যে শুল্ক কমিয়ে দিয়েছে। স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড ইনস্টলেশনের ক্ষেত্রে শুল্ক কমে শূন্য হয়েছে। সুবিধার বহরটা উপলব্ধি হয়, যখন তথ্য জানাচ্ছে এই ক্ষেত্রে আমেরিকা ৯ কোটি ২০ লক্ষ ডলারের জিনিসপত্র ভারতে রফতানি করে।

এরকম আরও অনেক হিসাব আছে– সিনথেটিক ফ্লেভারিং এসেন্সের উপর শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে কমে ২০ শতাংশ হয়েছে, এক্ষেত্রে ভারতের আমদানির পরিমাণ ২ কোটি ১০ লক্ষ ডলার। মাছের খাবার হাইড্রোলাইটের শুল্ক আগে ছিল ১৫ শতাংশ, গত সপ্তাহে সেটা কমিয়ে করা হয়েছে ৫ শতাংশ। এছাড়া কিছু বর্জ্য এবং স্ক্র্যাপ আইটেমের উপর কর পুরোপুরি তুলে দিয়েছে মোদি সরকার। এই খাতে ভারতের আমদানির পরিমাণ ২৫০ কোটি ডলার।
অর্থনীতিবিদরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন, আমেরিকা যদি সত্যিই ভারতীয় পণ্যের উপর প্রতিশ্রুতিমতো ২০ শতাংশ শুল্ক জারি করে, তাহলে ২০২৮ সাল নাগাদ ভারতের জিডিপি ০.১ শতাংশ কমবে। লন্ডন-ভিত্তিক ‘ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স’ জানাচ্ছে, ভারতের উপর ১০ শতাংশ ট্যারিফ বসালে, ভারত থেকে আমেরিকায় রফতানি ৫ শতাংশ কম হবে। যদিও সংখ্যাটাকে ধারে ও ভারে কম মনে হচ্ছে, তবুও শুল্ক যুদ্ধের ‘সর্পিল প্রভাব’ ভারতের পক্ষে যাবে না, এ-কথা জোর দিয়ে বলা যায়। ইতিমধ্যে ট্রাম্প সমস্ত দেশ থেকে আসা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের উপর ২৫ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক চাপিয়েছেন। এর সঙ্গে আগামী এপ্রিলে ভারতের আরও কয়েকটি পণ্যের উপর শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্ত আগাম ঘোষণা করেছেন।

এখনও পর্যন্ত ভারতের রপ্তানি দ্রব্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হল আমেরিকা। ২০২৩-’২৪ বর্ষে ভারতের রফতানি ছিল ৭৭ বিলিয়ন ডলার– যেটা মোট রফতানির ১৭ শতাংশ। সেই কারণেই শুল্ক যুদ্ধে শামিল হয়ে পড়া মানে ভারতের জন্য একটা বড় বাজার হারানো। অর্থনীতিবিদরা এত হারানোর আশঙ্কার মধ্যে কিছু প্রাপ্তির হিসাবও খুঁজে পেয়েছেন অবশ্য। তাঁদের মতে, আমেরিকা যদি সত্যি-সত্যিই চিনা দ্রব্যের উপর ৬০ শতাংশ ট্যারিফ বসায়, তাহলে বিশ্বের বৃহত্তম বহুজাতিক সংস্থাদের, যারা এত দিন চিনের সরবরাহের উপর নির্ভর করত, এখন অন্য সোর্সের কথা ভাবতে হবে। তখন ভারতীয় পণ্যে ২০ শতাংশ শুল্ক চাপলেও, তুলনামূলক কম শুল্ক ও সুলভ শ্রমিকের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ভারত চিনের হৃত জমি কিছুটা হলেও দখলে এনে নিজের ক্ষতিপূরণ করে লাভের মুখ দেখতে পাবে বলে অর্থনীতিবিদদের আশা। এখন, চিনের সর্বনাশে ভারতে পৌষমাস আসে কি না তা সময়ই বলবে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক অর্থনীতির অধ্যাপক, যোগমায়া দেবী কলেজ
[email protected]

 

২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'নজরে নবান্ন' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.