প্রতি বছরই নারীশক্তির আরাধনা হয়৷ কিন্তু সত্যি সত্যি নারীকে সম্মান জানানো হয় কতটা? দেবীপক্ষেও কি সুরক্ষিত নারীমর্যাদা? লিখলেন সুলয়া সিংহ৷
দৃশ্য এক: মঞ্চে সংবর্ধনা জানানো হচ্ছে ওলিম্পিকে ব্রোঞ্জজয়ী সাক্ষী মালিক ও রুপোজয়ী পি ভি সিন্ধুকে৷ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে প্রোদুনোভা ভল্ট স্পেশালিস্ট দীপা কর্মকারকেও৷ দেশকে পদক জেতানোর পর গজিয়ে ওঠা নতুন নতুন ফ্যানদের অটোগ্রাফ দেওয়া থেকে সেলফি তোলা, সবই চলছে৷ এই সুযোগে ওলিম্পিয়ানদের সঙ্গে দু-চারটে কথা বলে নিচ্ছেন নিরাপত্তারক্ষীরাও৷ অনুষ্ঠানে নারীশক্তিকে সম্মান জানাতে পেরে আপ্লুত আয়োজকরা৷
দৃশ্য দুই: দেবীপক্ষে মণ্ডপে মণ্ডপে মায়ের আগমন ঘটেছে৷ আকাশে-বাতাসে শিউলির গন্ধ৷ হঠাৎ করে মহিলাদের সম্মান একধাপ বেড়ে গিয়েছে৷ বাড়িতে দিদি, মা, কাকিমা আর বাইরে গার্লফ্রেন্ড যা বলছে, তাই বাধ্য ছেলের মতো মেনে নিচ্ছে বাবাই৷ দেবীপক্ষে মহিলামহলকে চটানো? নৈব নৈব চ! হাত জোড় করে মাথা নত করে দেবীর আরাধনাতেই শুদ্ধ হবে মন৷
দৃশ্য তিন: নাইট শিফট করে বান্ধবী সুজাতার সঙ্গে অফিস থেকে পিজিতে ফিরছেন রিয়া৷ হঠাৎ বাইকে একদল ছেলে এসে গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল৷ তারপর দু’ঘণ্টা ধরে চলল ধর্ষণ৷ গুরুতর আহত অবস্থায় দু’জনকে সেখানেই ফেলে রেখে চম্পট দিল ধর্ষকরা৷ রাতের অন্ধকারে কেউ কিচ্ছুটি টের পেল না৷ রোজ খবরের কাগজের শিরোনামে যা পড়তেন, আজ নিজেরাই সেই ঘটনার শিকার হলেন দুই যুবতী৷ কিন্তু দেবীপক্ষ যে এখনও শেষ হয়নি! তাহলে?
শহর জুড়ে, রাজ্য জুড়ে, দেশ জুড়ে প্রতিদিন জমা হচ্ছে ভুরি ভুরি মিথ্যে কথার পাহাড়৷ সভা, সম্মেলন, বৈঠক, সোশ্যাল মিডিয়া, সর্বত্র মিথ্যের স্তূপ উঁচু হয়েই চলেছে৷ নারীর মর্যাদা রক্ষা, দেবীপক্ষে নারীর বন্দনা এসব মিথ্যে ছাড়া আর কী! অথচ এই মিথ্যের জঞ্জাল সাফ করে ‘স্বচ্ছ ভারত’ তৈরির লক্ষণ চোখে পড়ছে কই? যুগ যুগ ধরে নারীর দেহের দখল নিয়ে পুরুষশক্তিই তো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এসেছে৷ আজও করছে৷ দেবীপক্ষে কি সত্যিই ছবিটা পাল্টায়? উত্তরটা মনে মনে সবাই জানে৷ জানে বলেই মেয়েকে রাতে ঠাকুর দেখতে পাঠাতে ভয় পান মা৷ অফিস থেকে নিরাপদে মেয়ে বাড়ি ফেরার প্রহর গোনেন৷
কাদের জন্য সমাজে আজও ত্রস্ত নারী? ধর্ষক কারা? তারা, যারা কারও ভাই অথবা বাবা অথবা স্বামী! হ্যাঁ, তাই তো৷ তারা তো আর ভিনগ্রহ থেকে উড়ে আসা ‘পিকে’ নয়৷ তাদের মানসিকতা, চোখের চাহনির মাপে নারী স্বাধীনতার মাপকাঠি তৈরি হবে৷ কেন? সব কেনর তো উত্তর হয় না৷ এরও নেই৷
ঘরের মেয়ে পদক জিতেছে৷ এই নারীশক্তিকে বরণ করে নিতে হবে না? কুস্তিগির সাক্ষী মালিক নিজের গ্রামে ফেরার পর খাপ পঞ্চায়েতের সদস্যদের ভাবটা ঠিক এমনই ছিল৷ রোহতকের ক’জন বাসিন্দা ‘হিপোক্রেসি’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত, সন্দেহ রয়েছে৷ কিন্তু তাই বলে কি হিপোক্রিট হওয়া যায় না? ক’জন আর মঙ্গলে পাড়ি দিয়েছেন৷ কিন্তু মঙ্গলে জল আছে কি না, সে আলোচনা তো অনেকেই করে থাকেন৷ দু’টো বিষয় একইরকম৷ হিপোক্রিটের দল সাক্ষীর সাফল্যে গর্বিত হয় আর বাড়িতে কন্যা সন্তানের জন্ম হলে অথবা জন্মের আগেই তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে৷ তাই দিনের শেষে মিথ্যে, মিথ্যে, সব মিথ্যে৷
এক সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছে ২০১৩ সালে এ দেশে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ৩০৯,৫৪৬টি কেস নথিভুক্ত হয়েছিল৷ ২০১৪ সালে যা বেড়ে হল ৩৩৭,৯২২৷ অর্থাৎ অপরাধের মাত্রা ৯.২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে৷ আর এই অপরাধের তালিকায় বাংলা দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে৷ গত বছর গোটা দেশে শুধু ২,০১৬টি গণধর্ষণের অভিযোগই রেজিস্টার হয়েছে৷ তাহলে অলিখিত গণধর্ষণের সংখ্যাটা আন্দাজ করে নেওয়া যেতেই পারে৷ চলতি বছর ফেব্রুয়ারির একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, মহিলা সুরক্ষার জন্য এ রাজ্যে ২১জন অফিসার রয়েছেন৷ হ্যাঁ, গোটা রাজ্যে ২১জন৷ এমন আঁটসাট নিরাপত্তায় নারী নিরাপদ থাকবে না তো কোথায় থাকবে! ওই ফুটপাতে মায়ের পাশে শুয়ে থাকা মেয়েকে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণের মতো ঘটনা তো ব্যতিক্রমী৷ ব্যতিক্রম তো আর উদাহরণ নয়৷ তাহলে কী দাঁড়াল? মিথ্যে, মিথ্যে, সব মিথ্যে৷
দেবীপক্ষ তো আসলে ছুতো৷ চিকন কোমর জড়িয়ে ধরে কাচের গ্লাসে চুমুক দেওয়ার ছুতো৷ শপিং করা আর ঘুরতে যাওয়ার ছুতো৷ দেবী দুর্গার যতই শক্তি থাকুক, মহিলা হয়ে জন্মালে ভরা রাজসভায় দ্রৌপদীকে লাঞ্ছিতা হতে হবেই, পুরুষদের তৈরি নিয়মের বইয়ে এটিই পাঁচ নম্বর নিয়ম৷ বাকি চারটে তো ‘পিঙ্ক’ ছবিতে আইনজীবী দীপক সেহগলই (পড়ুন অমিতাভ বচ্চন) বলে দিয়েছেন৷
দেবীপক্ষ, নারীশক্তি শব্দগুলো ছিল, আছে, থাকবে৷ শব্দের মানেগুলো? মিথ্যে, সব মিথ্যে৷