সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রধানমন্ত্রীর এই অঙ্গীকার কি বাস্তবে রক্ষিত হচ্ছে? ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানের সম্প্রচার অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে শোনার পরেও কিন্তু ধন্দ মিটছে না৷ আশা ছিল, দলিত নির্যাতন নিয়ে তিনি কড়া বার্তা দেবেন, গোবলয়ে যে-উৎপাত চলছে তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট করে বলবেন কিছু৷ কই, বললেন না তো?
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানটা মন দিয়ে শুনতে শুরু করলাম৷ এমন নয় যে, এই রবিবারের আগে এমন যে ক’টা অনুষ্ঠান তিনি করেছেন প্রতিটা মন দিয়ে শুনেছি৷ কিন্তু এবারেরটা শুনলাম৷ কারণ, আমার মন বলছিল, এবার অন্তত তিনি দলিত নির্যাতন নিয়ে কিছু কড়া বার্তা দেবেন৷ গো-রক্ষা নিয়ে গোবলয়ে গোমাতার কিছু ছেলেপিলে কিছুদিন যাবত্ যে-তাণ্ডব শুরু করেছে, তার বিরুদ্ধে কিছু-না-কিছু তাঁকে স্পষ্ট করে বলতেই হবে৷ কেননা, আসছে বছর উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাত-সহ গোবলয়ের চার রাজ্যে ভোট৷ ভোট বড় বালাই৷
কিন্তু ও হরি! নিজেকে তিনি দেশের পোস্টম্যান বললেন৷ রিও অলিম্পিকে দেশবাসীর শুভেচ্ছাবার্তা পাঠানোর দায় নিলেন৷ গর্ভবতী নারীদের প্রতি মাসের ৯ তারিখে সরকারি হাসপাতাল ও হেল্থ সেণ্টারে বিনি পয়সায় চেক-আপের বন্দোবস্তের কথা শোনালেন৷ ছেলেছোকরাদের গাদাগুচ্ছের অ্যাণ্টিবায়োটিক খেতে বারণ করলেন৷ রাখি পূর্ণিমার দিন ভাইয়েরা যাতে বোনেদের বিমা উপহার দেন সেই পরামর্শ দিলেন৷ অথচ গো-রক্ষার নামে দলিত নির্যাতন নিয়ে স্পিকটি নট! আমার আরও অবাক লাগল যখন শুনলাম, ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে তাঁর কী কী বলা উচিত সে-বিষয়ে দেশের মানুষকে তিনি পরামর্শ দিতে বললেন!
আমি অতি বিনম্রতার সঙ্গে বলতে চাই, প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আমার এই লেখাটি আপনি সেই পরামর্শ বলে বিবেচনা করুন৷ একবারের জন্য হলেও প্লিজ আপনি ক্রমশ বেড়ে চলা অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সোজাসুজি ও স্পষ্ট ভাষায় কিছু বলুন, যাতে বোঝা যায়, এসব বেয়াদপি আপনি পছন্দ করছেন না, যাতে বোঝা যায় আপনার দল ও সরকার এইসব বেয়াদপকে কড়া সাজা দিতে প্রস্তুত৷ স্বাধীনতা দিবসের দিনই আপনি এই বার্তা দিন যে, এদেশের মানুষের স্বাধীনতা আপনি হরণ হতে দেবেন না৷
এই কথাটাই ইনিয়ে-বিনিয়ে নয়, একেবারে সোজাসুজি বলে দিয়েছেন মার্কিন বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জন কার্বি৷ তিনি বলেছেন, মানুষের স্বাধীনতা রক্ষা করা ভারত সরকারের কর্তব্য৷ ভারত যেন সেই কর্তব্য পালন করে ও অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেয়৷ অভ্যন্তরীণ কোনও বিষয়ে কোনও বিদেশি টিপ্পনী করবেন, ভারতের পক্ষে তা মেনে নেওয়া কঠিন৷ অন্য কোনও দেশ এই জ্ঞান দিলে ভারত হয়তো ফোঁস করে উঠত৷ কিন্তু দেশটার নাম যে আমেরিকা! কার্বির তেতো বড়ি বিনা বাক্যে ভারতকে তাই হজম করতে হল৷
অথচ বিচলিত নন প্রধানমন্ত্রী৷ সংসদের অধিবেশন চলছে৷ দুই কক্ষই দলিত নির্যাতন নিয়ে উত্তাল৷ আমির খান বছরখানেক আগে অসহিষ্ণুতা নিয়ে মন্তব্য করে শাসকদলের বিরাগভাজন হয়েছিলেন৷ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর সেই বিতর্কে নতুন করে ঘি ছিটিয়েছেন৷ এ নিয়েও সংসদ সরগরম৷ কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আজ পর্যন্ত কোনও বিরোধী-দাবি মেনে সংসদে এই জাতীয় কোনও ঘটনার নিন্দা করেননি৷ মুজফ্ফরনগর দাঙ্গা নিয়ে তিনি মুখ খোলেননি৷ দিল্লি-লাগোয়া নয়ডার দাদরি গ্রামে গোমাংস রাখার অপবাদে নিহত মহম্মদ একলাখকে নিয়েও মুখ খোলেননি৷ গোহত্যা ও গোমাংস নিয়ে রাজ্যে রাজ্যে গো-রক্ষকরা যে-তাণ্ডব শুরু করেছে, তা নিয়েও তিনি চুপ৷ মধ্যপ্রদেশে এমন ঘটছে, হরিয়ানায় ঘটেছে, রাজস্থানে ঘটেছে, তাঁর নিজের রাজ্য গুজরাতের উনাতেও ঘটে গেল৷ সেখানে চার-চারজন দলিতকে নগ্ন করে ট্রাকের সঙ্গে বেঁধে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে আধমরা করে তোলা হল, গরুর চামড়া ছাড়ানোর অপরাধে! অথচ প্রধানমন্ত্রীর মুখে আমরা ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ শুনে চলেছি! দক্ষিণ আফ্রিকা তাঁর কাছে কত বড় তীর্থযাত্রা সেই মাহাত্ম্য শুনছি৷ তাঁকে দেখে একবারের জন্যও মনে হচ্ছে না, ক্রমশ বেড়ে চলা অসহিষ্ণুতার তিনি আদৌ চিন্তিত৷ ভাবখানা এমন, আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী৷ দেশের বিকাশ ও উন্নয়নই আমার কাছে পাখির চোখ৷ ছোটখাটো এসব বিষয়ে মাথা গলালে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হয়ে যাবে৷ আমি ডিফোকাসড হব না৷
অথচ ফোড়াটা পাকতে শুরু করে দিয়েছে৷ বিজেপির দলিত নেতারা গলা চড়াতে শুরু করেছেন৷ গো-রক্ষার নামে হুজ্জুতিকে তাঁরা ‘গুন্ডাগর্দি’ বলতে দ্বিধা করছেন না৷ বিপদটা যে কীরকম তা তাঁরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন৷ উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে একের পর এক দলিত নেতা তাই দলকে কড়া বার্তা দেওয়ার দাবি জানাতে শুরু করেছেন৷ মহারাষ্ট্রে বিজেপির শরিকদলের নেতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আতওয়ালে তীব্র কটাক্ষে বলেছেন, মানবরক্ষার চেয়ে গো-রক্ষা বড় হতে পারে না৷ কিন্তু মোদি-মৌনতা ভাঙে কার সাধ্যি!
সেই সুযোগে গুজরাতের দলিতেরা আন্দোলনের ধার দিন দিন বাড়িয়ে চলেছেন৷ তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মরা গরুর চামড়া ছাড়ানোর মতো কাজ তাঁরা আর করবেন না৷ আমেদাবাদ থেকে উনা পর্যন্ত তাঁরা পদযাত্রা করবেন৷ স্বাধীনতা দিবসে সেই যাত্রা উনায় শেষ হওয়ার কথা৷ গুজরাতে বিজেপির ভিত এমনিতেই নড়বড়ে করে দিয়েছেন হার্দিক পটেল নামে অজ্ঞাতকুলশীল এক তরুণ৷ পটেলদের মধ্যে যাঁরা পতিদার সম্প্রদায়ের, তাঁদের সংরক্ষণের প্রশ্নে রাজ্যকে তিনি উত্তাল করে তুলেছিলেন৷
সামাল দিতে তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপি দেশদ্রোহিতার মামলাও ঠুকে দিয়েছে৷ এই বোঝার ওপর শাকের আঁটি দলিত-ক্ষোভ৷ দয়াশঙ্কর বলে উত্তরপ্রদেশের বিজেপির এক বিধায়ক দলিত নেত্রী মায়াবতীকে অকথা-কুকথা বলে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বিএসপি’র পালে হাওয়া জোরালো করে দিয়েছেন৷ মায়াবতীর পোয়াবারো৷ দলিত নির্যাতন নিয়ে ‘দেশ সেবক’ যতটা মৌন, ঠিক ততটাই মুখরা তিনি৷ আপাতত এটাই তাঁর প্রচারের হাতিয়ার৷
লোকসভার ভোটে উচ্চবর্ণের পাশাপাশি দলিত ভোটও উত্তরপ্রদেশে বেশ খানিকটা মোদির নামে ভেসে গিয়েছিল৷ কোনও কোনও কেন্দ্রে মুসলমান ভোটও৷ মায়াবতী তাই বিশ শতাংশ ভোট পেয়েও একটিও আসন পাননি৷ এবার কংগ্রেসও কোমর কষে নেমেছে৷ ব্রাহ্মণের পাশাপাশি উচ্চবর্ণের ভোট পেতে শীলা দীক্ষিতকে আগেভাগে আসরে নামিয়ে দিয়েছে৷ শীলার সঙ্গী গুলাম নবি আজাদ, রাজ বব্বর ও সঞ্জয় সিং৷ অর্থাত্ সেই ব্রাহ্মণ+মুসলমান+ঠাকুরদের পুরনো কম্বিনেশন৷ সোনিয়া-রাহুলরা দলিত-নিধন নিয়ে আসর গরম করে দিয়েছেন৷ বারাণসীতে সোনিয়ার রোড শো শুরু হচ্ছে আম্বেদকরের মূর্তির পাদদেশ থেকে৷ শেষ হচ্ছে কমলাপতি ত্রিপাঠীর মূর্তিতে৷ মাঝে টুক করে বাবা বিশ্বনাথ দর্শনও করে আসছেন তিনি, আজ পর্যন্ত যেখানে কখনও যাননি৷ মুলায়ম-অখিলেশরা তাঁদের যাদব-মুসলমান ‘কোর সাপোর্ট বেস’ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন৷ আইনশৃঙ্খলা এতটাই বেহাল ও ‘বহেনজি’ এতখানি রণংদেহী যে, বাপ-বেটা হালে পানি পাচ্ছেন না৷ এই ভোট-দামামায় দলিত নির্যাতন যোগ করে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা৷
বিজেপির রেডারেও কিন্তু এই দলিতরাই সবার আগে৷ কারণ তারা জানে, রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে মুসলমান কখনওই বিজেপিকে কোল পেতে দেবে না৷ উত্তরপ্রদেশের যাদবদের পছন্দের শুরু ও শেষে একটাই দল–সমাজবাদী পার্টি৷ বাকি থাকে তফসিল সমাজ, রাজ্যের ৪০৩টি নির্বাচনী কেন্দ্রে যাদের উপস্থিতি কম করে ৫০ হাজার৷ মোট ভোটের ২২ শতাংশ এই তফসিলরা, যাঁদের ৬০ শতাংশই মায়াবতীর জাত, জাটভ৷ এই ৬০ শতাংশের অধিকাংশের ভগবানের নাম বাবাসাহেব আম্বেদকর৷ সেই আম্বেদকর, যিনি বর্ণহিন্দুদের অত্যাচারে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হয়ে নিজের মতো করে প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন৷ বিজেপি বৌদ্ধদের দিয়ে দলিত মন জয়ের একটা চেষ্টা শুরু করেছে৷ কিন্তু অর্বাচীন গো-রক্ষকদের অতি উৎসাহে সে-গুড়েও বালি পড়েছে৷
একটা নমুনা দিই৷ এই সেদিন আগ্রায় অমিত শাহর জনসভা ছিল৷ দিল্লির সদর দফতর থেকে বলা হল, অন্তত একলাখ মানুষের জমায়েত হবে ওই জনসভায়৷ পরের দিন জানা গেল, ময়দান ফাঁকা ছিল বলে জনসভাই বাতিল করা হয়েছে৷
এই উত্তরপ্রদেশের সারনাথ থেকে ২৪ এপ্রিল বিজেপি এক মহাযাত্রা শুরু করেছে৷ চল্লিশজনের মতো বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সন্ন্যাসী-সহ কয়েকশো দলীয় কর্মী-সমর্থক এই যাত্রায় শামিল হয়েছেন৷ রাজ্যের সবক’টা বিধানসভা কেন্দ্র ঘুরে ১৪ অক্টোবর লখনউয়ে এই যাত্রা শেষ হবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের মধ্য দিয়ে৷ ইতিমধ্যেই ১০ হাজার কিলোমিটার পথ ঘুরেছে এই যাত্রা৷ অমিত শাহর ধারণা, বৌদ্ধদের সামনে রেখে তাঁরা মায়াবতীর দলিত ভোট-বাক্সের তালা ভেঙে ফেলবেন৷
সেটা করতে গেলে গো-রক্ষকদের হুজ্জুতি থামাতে হয়৷ সমাজের প্রান্তিক মানুষদের অধিকারে অযথা হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হয়৷ সে জন্য প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কর্তাদের কড়া কড়া কথা বলতে হয়৷ দেশ ও সমাজে শান্তি ও স্বস্তির আবহ আনতে হয়৷ দেশে যে আইনের শাসন রয়েছে, জনতাকে তা অনুভব করাতে হয়৷ শুধু উন্নয়ন, বিকাশ, স্বচ্ছ ভারত, জনধন যোজনা বা কৃষি বিমার মতো মিষ্টি মিষ্টি কথা এবং একজন আনন্দিবেন পটেলের কুর্সি কেড়ে নিলে চিঁড়ে ভিজবে না৷
লালকেল্লার ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর মুখ ফোটে কি না দেখার অপেক্ষায় রইলাম৷
(মতামত লেখকের নিজস্ব)