ধ্রুবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায়: পূর্ণিমা পেরিয়েছে সবে দিন পাঁচেক। শীতল-সাদা রং পুড়ে হলদেটে হয়ে ক্ষয়ে চলেছে চাঁদ। আদরের পোষ্য কুট্টুসের সঙ্গে দৌড়চ্ছে টিনটিন। আস্তে আস্তে পা থেকে মাথা মিলিয়ে যাচ্ছে। চাঁদকে তার গোটা একবার পাক খেয়ে ফের সামনে আসতে আরও এক মাস। অবাক লাগছে? পূর্ণিমার সঙ্গে টিনটিনের দৌড়! হিসেব মিলছে না?
[ আরও পড়ুন: বৈদ্যুতিন চুল্লি নয়, অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী CNG-তে শেষকৃত্য হবে শীলা দীক্ষিতের]
আগামী সোমবার চন্দ্রযান ২-এর উৎক্ষেপণ। এর আগে গত রবিবার মাঝরাতে তার উড়ানের দিন ধার্য ছিল। প্রযুক্তিগত সমস্যায় দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তার মাঝে দিন পাঁচেকের সময় পেরিয়েছে। পূর্ণিমার চাঁদের বুকে যতবার চোখ পড়েছে, ততবার মনে হয়েছে সেটা কোনও ক্ষত নয়। আসলে টিনটিন দৌড়ে চলেছে। তার চাঁদের অভিযান শেষ হয়নি। পাক খেয়ে চলেছে অনবরত। এই প্রসঙ্গেই সামনে আসছে চন্দ্রযানের পাক খাওয়ার গল্পও। ইসরো জানিয়েছে, উৎক্ষেপণ ৮ দিন পিছিয়ে গেলেও চন্দ্রযান চাঁদের মাটি ছোঁবে নির্দিষ্ট দিনেই। অর্থাৎ, ৬ সেপ্টেম্বরই। উৎক্ষেপণের দিন পিছিয়ে গিয়েও কীভাবে চন্দ্রযান ২ একই দিনে পৌঁছবে? যে ৫৪ দিন পাক খেয়ে তার চাঁদে পৌঁছনোর কথা, কী হবে সেই দিনক্ষণের হিসাবের?
বিজ্ঞানীরা বলছেন এটা ‘লঞ্চ উইনডো’-র ম্যাজিক। জিএসএলভি রকেট ফ্যাট বয়ের প্রযুক্তিগত সমস্যা ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গত রবিবার মাঝরাত থেকেই তার কারণ খোঁজা শুরু করে। রকেটের গায়ে চড়েই প্রথমে গ্যাস সিলিন্ডারটিকে পৃথক করার কাজ শুরু হয়। সেখান থেকে গ্যাস বের করে শুরু হয় পরীক্ষা। ইসরো কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা এই অভিযানকে বাঁচিয়ে রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তার সঙ্গে জানিয়েছিল, যতক্ষণ না তারা মূল সমস্যার সমাধান করবে, ততক্ষণ পরবর্তী উড়ান নিয়ে কিছু বলবে না। সে সময় মনে করা হয়েছিল, কম করে এক মাস লাগবে এই উড়ানে। মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ কমিটি নাওয়া-খাওয়া ভুলে সমস্যা সমাধানের কাজ শুরু করে। তার প্রায় তিন দিনের মাথায় ইসরো জানিয়ে দেয়, তারা ফের প্রস্তুত। পূর্ব নির্ধারিত সময়েই চাঁদে নামবে যানটি।
[ আরও পড়ুন: চোর সন্দেহে দলিত যুবককে মার, গায়ে পেট্রল ঢেলে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা ]
হাতে ‘বাফার টাইম’ রেখেই চাঁদের নামার প্রস্তুতি শুরু করেছিল ইসরো। কী সেটা? কোনওভাবে প্রথম উড়ানে বাধা এলে যাতে হাতে সময় থাকে, সেসবের হিসাব কষাই ছিল। ১৫ জুলাই উড়ান হলে চাঁদের ‘লঞ্চ উইনডো’ একদিনে পাওয়া যেত ১০ মিনিট। যা সবচেয়ে বেশি। পৃথিবী থেকে চাঁদের পৌঁছনোর দিনের হিসাবকেই লঞ্চ উইনডো বলা হয়। এই সময় চাঁদ ও পৃথিবী পরস্পরের সবচেয়ে কাছে থাকে। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকে। ১৫ জুলাইয়ের পর থেকে সেই লঞ্চ উইনডো কমছে। প্রতিদিনের হিসাবে যা পাওয়া যাচ্ছে ১ মিনিট করে। ইসরোর মতে, তার পরও হাতে পর্যাপ্ত দিন সময় রয়েছে। পৃথিবী থেকে ওড়ার পর চাঁদে পৌঁছতে সব মিলিয়ে ৫৪ দিন সময় রাখা হয়েছিল। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ওড়ার পর পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চন্দ্রযান ২ চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছতে সময় নেবে ২২ দিন। চাঁদের চারপাশে এর পর তার পাক খাওয়ার কথা ছিল ২৮ দিন। সেখানে অরবিটার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিক্রম ল্যান্ডার আরও চার দিন পর নামবে চাঁদের মাটিতে। বিজ্ঞানীদের মতে, “পৃথিবী থেকে চাঁদ পর্যন্ত উড়ানের নির্ধারিত দিনের হিসাবে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। ২২ দিনেই চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছবে চন্দ্রযান ২।” এর পরের কর্মসূচিতে কিছুটা বদল আনা হয়েছে। চাঁদের চারপাশে ঘোরার জন্য যে ২৮ দিন রাখা ছিল, বিজ্ঞানীদের মতে, তাতেই বাড়তি সময় ধরা হয়েছিল সাতদিন। প্রযুক্তিগত কারণে বাধা পেয়ে যে ৮ দিন পৃথিবীতে নষ্ট হয়েছে, সেখানেই তা পূরণ করা হবে। কমানো হবে চাঁদের কক্ষপথে পাক খাওয়ার সংখ্যা। অর্থাৎ এবার ৭ দিন আগেই চাঁদের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ শেষ করবে অরবিটার।
[ আরও পড়ুন: নির্বাচন কমিশনের পোস্টারে জ্বলজ্বল করছে নির্ভয়ার ধর্ষকের ছবি! তুঙ্গে বিতর্ক ]
তার পর গতি কমিয়ে তার চারদিনের মাথায় চাঁদের আলতো করে লাফিয়ে নামবে বিক্রম ল্যান্ডার। কিন্তু এভাবে প্রদক্ষিণের সময় কমিয়ে দিলে কি একেবারেই কোনও সমস্যা হবে না? যেখানে ইসরো প্রধান কে শিবান ১৫ জুলাই উৎক্ষেপণের দিন ধার্য করে জানিয়েছিলেন, এই দিনেই সবচেয়ে বেশি লঞ্চ উইনডো পাওয়া যাবে। যেখানে বিজ্ঞানীদের একাংশ কখনই এই অভিযান নিয়ে তাড়াহুড়ো করার পক্ষপাতী নন। তাঁদের অনেকেই বলছেন, এমন লঞ্চ উইনডো বছরে অনেকবার আসে। ইসরোর এক বিজ্ঞানী দৃঢ়তার সঙ্গে কোনওরকম সমস্যা হওয়ার প্রতিবাদ করে জবাব দিয়েছেন সাংবাদিকদের। বলেন, “ইসরোর আগের অভিযানগুলো দেখুন। যে নির্ধারিত দিনে কোনও যান পাঠানোর কথা বলা হয়েছে, সেইদিনেই তা পৌঁছেছে। আর ইসরো এসব নিয়ে মোটেই তাড়াহুড়ো করে না। সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে তবেই শূন্যে পা বাড়ায়।” ইসরোর যে আত্মবিশ্বাসকে প্রকাশ্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বহু প্রতীক্ষিত ছবি ‘মিশন মঙ্গল’-এর অভিনেতা অক্ষয় কুমার।