বুদ্ধদেব সেনগুপ্ত, হায়দরাবাদ: হায়দরাবাদ ঘরের মাঠে গোহারা হার। তিন মাসের মধ্যেই প্রতিপক্ষের মাঠে মসৃণ জয় ছিনিয়ে আনলো সীতারাম ইয়েচুরির নেতৃত্বাধীন বঙ্গ ব্রিগেড। কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের বিরোধিতার রাস্তা থেকে সরে আসতে বাধ্য হল প্রকাশ কারাতের কেরল শিবির। শুক্রবার পার্টির স্টিয়ারিং কমিটির দীর্ঘ বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত হয় আগামিদিনে সিপিএম কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনে আসন সমঝোতা করবে। আচমকা প্রকাশ শিবিরের মত পরিবর্তনের পিছনে অবশ্যই ‘অদৃশ্য’ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও কেরলের নবতিপর সিপিএম নেতা ভিএস অচ্যুতানন্দনের বুডড়ো হাড়ের ভেল্কির খেলা আছে বলেই মনে করছেন হায়দরাবাদে পার্টি কংগ্রেসে যোগ দিতে আসা প্রতিনিধিরা।
[উপরাষ্ট্রপতির কাছে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব বিরোধীদের]
জোট বিরোধী শিবির শেষ মুহূর্তে পিছু হটায় স্বভাতই খুশি বঙ্গ সিপিএম। সংখ্যালঘু না সংখ্যাগুরু। বাংলা না কেরল। ইয়েচুরি নাকি প্রকাশ কারাট। কার দেখান রাস্তায় ভোটের রাজনীতি করবে পার্টি। কোন রাস্তায় হাঁটবে দেশের কমরেডকুল৷ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পথ যে মসৃণ নয় গতকালই টের পেয়েছেন একে গোপালন ভবনের কর্তারা। পার্টি কংগ্রেসের সভাঘর ‘কল্যাণ মন্ডপম’ কার্যত মেছোহাটে পরিণত হয়েছে। একের পর এক রাজ্য যেমন পার্টির ‘অফিসিয়াল লাইন’ কারাতপন্থীদের পথ জোট বিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। তেমন জোটপন্থী ইয়েচুরি—বিমান—সূর্যকান্তদেরও প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। এদিন সম্মেলন শুরু হতেই চমক দেন বাংলার দুই প্রতিনিধি শমিক লাহিড়ি ও সোমনাথ ভট্টাচার্য। দু’জনেই বক্তব্য শেষ করে লিখিতভাবে গোপন ব্যালটে ভোটাভুটির দাবি করেন। তাঁদের দেখান পথে হাঁটতে থাকেন বিহার, ঝাড়খন্ড, মহারাষ্ট্র—সহ সতেরোটি রাজ্যের প্রতিনিধিরা। গোটাটাই গৌতম দেবের মস্তিষ্কপ্রসূত। কারাত ঘনিষ্ঠদের চাপে ফেলতেই তাঁর এই কৌশল বলেই মনে করা হচ্ছে।
জোট ইস্যুতে প্রতিনিধিরা আড়াআড়ি দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ায় ভোটের রাজনীতির রাস্তা খোঁজতে বসে ভোটাভুটির পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজনৈতিক রণকৌশনের লাইন খুঁজতে বসে গোপন ব্যালটে ভোটাভুটির দাবি নেতৃত্বের কাছে নবতম সংকট। সংকট কাটাতে বৈঠকে বসে স্টিয়ারিং কমিটি। সেখানেই সীতা বনাম প্রকাশ লড়াই শুরু হয়। যুক্তি পাল্টা যুক্তির লড়াই চলে। ইয়েচুরি গোপন ব্যালটের দাবি জানালে আপত্তি জানান কারাত। পার্টির স্বয়ং সাধারন সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি সরাসরি গোপন ব্যালটে ভোটাভুটির সম্ভাবনা খারিজ না করলেও তাঁর প্রবল বিরোধী বলে পরিচিত প্রকাশ প্রকাশ কারাত দুপিরেই হাত তুলেই ভোট হবে বলে সাফ জানিয়ে দেন। যখন ভোটাভুটি প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে তখন মাঠে নামেন ভিএস অচ্যুতানন্দন৷ সঙ্গী বিমান বসু—সূর্যকান্ত মিশ্র। জনে বোঝাতে থাকেন জোটের প্রয়োজনীয়তা ও বিজেপির বিপদ৷ উদাহরণ হিসাবে ত্রিপুরার পরাজয়কে ঢাল করেন তাঁরা।
[টানা ৭ দিনে অনশন, ধর্ষণ রুখতে লড়াই জারি দিল্লি মহিলা কমিশনের প্রধানের]
পার্টি কংগ্রেস সূত্রে খবর, ঘনঘন খবর যায় কলকাতার পাম এভিনিউতে৷ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য়র সঙ্গে যোগাযোগ করেন গৌতম দেবরা। আসরে নেমে প্রকাশ ও সীতারামের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। আবার স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে আচমকাই কারাত শিবিরের প্রধান সৈনিক কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন সীতা ও প্রকাশকে বিনা ভোটাভুটিতে বিরোধ মিটিয়ে নেওয়ার আবেদন জানান৷ এরপরেই কারাত নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেন বলে খবর। ভোটের রাজনীতির রাস্তা চূড়ান্ত হওয়ার পরেই নতুন করে লড়াই শুরু প্রকাশ ও সীতা শিবিরে। পার্টির সংগঠনের হাল কাদের হাতে থাকবে এদিন রাত থেকেই সেই লড়াই শুরু হয়েছে৷ রাতেই সাংগাঠনিক দলিল পেশ করা হয় আলোচনার জন্য। আজ সকাল থেকেই সংগঠনের করুণ হাল নিয়ে বিতর্ক করবেন কমরেডরা। তা শেষ হতেই হবে কমিটি গঠন। সেখানেই সীতারামের ভবিষ্যত ঠিক হবে।
কারণ সাধারন সম্পাদকের দৌড়ে রয়েছেন কারাত জায়া বৃন্দা, মানিক সরকার এ রাঘভুলুর মতো পলিটব্যুরোর সদস্যরা৷ আর গতবারই কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সেচ্ছায় সরে গিয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য৷ রাজ্য কমিটি থেকে ইতিমধে্যই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে শ্যামল চক্রবর্তী, মদন ঘোষ, দীপক সরকারদের মতো প্রবীণদের। এবার কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেও বাদ যাবেন শ্যামল—মদন। বাদ যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দীপক দাশগুপ্ত ও গৌতম দেবের। যে জায়গায় কারা স্থান পাবেন তা নিয়েও শুরু হয়েছে টানাপোড়েন।
সুজন চক্রবর্তী ও অশোক ভট্টাচার্যরা কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পেতে পারেন বলে খবর। এছাড়াও সিটুর কোটায় অনাদি সাহু বা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একজন ও যুবদের মধ্য থেকে তাপস সিনহা অথবা আভাস রায়চৌধুরিকে শীর্ষ কমিটিতে পাঠান হতে পারে বলে সিপিএম সূত্রের ইঙ্গিত।