ব্রতীন দাস, শিলিগুড়ি: ধানখেতের পাশের ডোবায় শালুক ফুটেছে। ছোট্ট ঝুপড়ির গা ঘেঁষে চলা রেললাইনের ধারে শরতের হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে একগুচ্ছ কাশফুল। ঢ্যাংকুরাকুর বোল ভেসে আসতে বস্তির কচিকাঁচারাও আনন্দে মাতোয়ারা। এক চিলতে অন্ধকার কুঁড়েঘরে আধশোয়া মেয়েটা মলিন পর্দা সরিয়ে চোখ রাখে জানালায়। জলফড়িং হয়ে উড়ে যায় তার স্বপ্নগুলো। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে মা-কে খুঁজতে থাকে পায়েল। মুদি দোকানে ধার শোধ দিতে মাটির বাঁধের কাজে গিয়েছে মা। মায়ের পিঠে চড়েই তো তার জীবনযুদ্ধ!
[মুসলিম পটশিল্পীর সৃজনেই সেজে উঠছে রূপচাঁদ মুখার্জি লেনের মণ্ডপ]
অষ্টমীতে ঢাকের বাদ্যি কানে এলে ভাঙা ঘরের জানালা দিয়ে জোড়হাতে প্রণাম করে পায়েল। কিন্তু মণ্ডপে যাওয়া হয়ে ওঠে না। ‘হয়তো আর কোনওদিন হবেও না…।’ অস্ফুটে কথাটা বলতেই চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে মেয়ের। ভারী হয়ে আসে গলা। হুইসল দিয়ে একটা ট্রেন চলে যায়। অঞ্জলিদেবী বলেন, ‘‘জামাটা বদলে নে। কলেজ যেতে হবে তো।’’ জামা বদলে, হাতে বই-খাতা নিয়ে মায়ের পিঠে চেপে কলেজের পথে রওনা হয় পায়েল। অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তিতে ভর করে এখন সে বাগডোগরা কলেজের বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। বাবা সুনীল রায় রং-মিস্ত্রি ছিলেন। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চার বছর আগে গত হন। সুনীলবাবু মারা যেতেই বাড়িতে ঘোর অমাবশ্যা নেমে আসে।
[অশুভ বিনাশে এবার পুজোয় ‘অসুর’ ধর্ষক বাবা রাম রহিমই]
বিরল রোগের শিকার পায়েল। কুড়ি বছরেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। দিন দিন সরু হয়ে বেঁকে যাচ্ছে পা দু’টো। সোজা হয়ে বসতে কিংবা শুতে পারেন না। হাত-পা টান করলে যন্ত্রণায় ফেটে যায়। চিকিৎসার সামর্থ্য নেই। কিন্তু সব যন্ত্রণা বুকে চেপে হাল ছাড়তে নারাজ এ মেয়ে। মায়ের বরাভয়ে বাধা টপকে এগিয়ে যেতে চান পায়েল। গর্ভধারিণী মা একশো দিনের কাজ কিংবা অন্যের বাড়ির কাজ করে ভাতের ব্যবস্থা করেন। তাঁর একটাই লক্ষ্য, মেয়ের লড়াইয়ে সঙ্গ দেওয়া। কলেজ শেষ করে মায়ের পিঠে চড়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখতে চায় মেয়ে। তাঁর স্বপ্ন, শিক্ষকতা করা। বলে, “মা-ই আমার কাছে সর্বশক্তির উৎস।’’ বহুদিন পর এবার পুজোয় জামা হয়েছে অভাগীর। তাঁকে দিয়ে পুজো অ্যালবাম প্রকাশ করিয়েছেন শিলিগুড়ির সংগীতশিল্পী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়। হাতে তুলে দেন দু’টো পুজোর জামা। নতুন জামার গন্ধ মেখে রং-তুলি হাতে তুলে নেয় পায়েল। দুর্গার ছবি আঁকতে বসে রঙের কোলাজে ক্যানভাসে ফুটে ওঠে নিজের মায়ের মুখ। সেই ‘দুগ্গা’-র চক্ষুদান হয় মেয়ের হাতেই। ঢাক বাজিয়ে মণ্ডপের পথে কারা যেন উমাকে নিয়ে যায়। আদুরে ঢঙে মায়ের কোলে মাথা রাখে পায়েল। ডোবা থেকে একটা শালুক তুলে এনে দেওয়ার আবদার জোড়ে সে। মেয়ের মুখে এক ঝলক হাসিতে অঞ্জলিদেবীর আটপৌরে শাড়িতে লুটোপুটি খায় শরতের সকাল।