তন্ময় মুখোপাধ্যায়: দোকান বা বাড়ি। বাঙালির আড্ডার সঙ্গে জড়িয়ে চা। আর চায়ের সঙ্গে টা মানেই বিস্কুট। কাপের পর কাপ চা উড়িয়ে রসালো আলোচনা যেন শেষ হতে চায় না। কেউ দুধ, কেউ লিকার, কারও আবার অন্যরকম চা পছন্দ। তবে এখন যা অবস্থা তাতে পাঁচ টাকায় কোনওভাবে চা মেলে। বিস্কুটের দাম অন্তত এক টাকা। এমন বাজারে মাত্র ২ টাকায় দুধ চা, সঙ্গে বিস্কুট। চোখের ভুল নয় সামান্য খরচ করলেই মিলবে উষ্ণ অভ্যর্থনা। তবে এই সুযোগ মাত্র এক মাসের জন্য। সেলের ধাঁচে চা ব্যবসায় চৈত্র সেল। চায়ের দোকানে সেল এবং নামমাত্র দামে এই ব্যবস্থা এনে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন শিশির বন্দ্যোপাধ্যায়।
[দেবের হাত ধরে বড় পর্দায় পদ্মশ্রী সুবাসিনী মিস্ত্রির সংগ্রাম]
নবদ্বীপের স্টেট জেনারেলের হাসপাতালের পাশেই তাঁর দোকান। রোজ অন্তত পাঁচ-ছশো কাপ চা বিক্রি হয়। মোদ্দা কথা চালু এবং পরিচিত দোকান। শিশিরবাবু তিন টাকাতেই এতদিন দুধ চা এবং বিস্কুটের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আচমকা কেন এক টাকা দাম কমালেন? হাসতে হাসতে প্রৌঢ় দোকানি বলছেন সে যে অনেক গল্প। আসলে বেশ কয়েক বছর ধরে তাঁর এমন পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ট্যাঁকের জোর ছিল না। এবার রেস্ত হওয়ায় ঠিক করে ফেলেন চায়ের দাম এক টাকা কমাবেন। সেলের ভাবনাটা একেবারে তাঁর নিজস্ব। কেটলি চাপিয়ে শিশিরবাবু বলে যান, কেউ এমন কাজ করেনি। গোটা বাংলা এমন কোনও দৃষ্টান্ত তাঁর নজরে আসেনি। এই কর্মকাণ্ড সবাইকে জানাতে পাঁচ-ছয়টি ফ্লেক্স ছাপান। যার একটি দোকানের সামনে জুড়ে দেন। আর বাকিগুলি এলাকার টোটোর পিছনে। ফল যে এত দ্রুত আসবে তা কল্পনা করতে পারেননি। এমন ফ্লেক্স কৌতুহলীদের নজর এড়ায়নি। তাদের তোলা গরিব টি স্টলের ২ টাকার দুধ চা ও বিস্কুট সোশ্যাল মিডিয়ায় একেবারে সুপারহিট। কেউ কাঁথি থেকে খোঁজ নিচ্ছেন। কোচবিহারেরও সমান আগ্রহ।

[হেঁচকির জ্বালায় হাসপাতালে নববধূ, পণ্ড হল বউভাত]
এবার চৈত্র সেলের তাঁর দুধ চা দেওয়া হবে কাগজের কাপে। পরিমানও ফেলনা নয়। প্রায় ৪০ মিলিমিটার। তবে লিকার বা অন্য কোনও চায়ের বায়না করলে ২ টাকায় হবে না। শিশিরবাবু যখন এই পরিকল্পনার কথা বন্ধু ও খদ্দেরদের বলেছিলেন তারা হেসেই খুন হয়ে যায়। উপযাচক হয়ে তারা এক বাক্যে বলেছিলেন শিশিরের বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই চা বিক্রেতা ২ টাকাতেই চা-বিস্কুট খাওয়াবেন। তবে কি গ্যাঁটের থেকে মানে ভরতুকিতে চালাবেন? একটু থেমে শিশিরবাবুর সটান জবাব, ‘‘বুঝলেন একটু কম লাভ করলে কোনও ক্ষতি নেই। ২০০ টাকার চা বেচলে খুব খারাপ হলেও ১৫ থেকে ২০ টাকা পকেটে আসবে। এত মন্দ কী মশাই!’’ আসলে লাভের অঙ্ক তাঁর যে অভিজ্ঞতায় গাঁথা। কীভাবে? শিশিরবাবু জানালেন তাঁর দোকানে স্রেফ চা-বিস্কুটের জন্য তো লোক আসে না। কেক, সিগারেট, টুকিটাকি জিনিসপত্র ভাল বিক্রি হয়। ওইসব থেকে যা লাভ হয় তাতে তাঁর, ছেলের এবং স্ত্রীর ভালমতো পেট চলে যায়। অতএব লোক যদি একটু কম পয়সায় চা পায় তাহলে অসুবিধার কিছু নেই।
[কে আগে বাড়ি যাবে? দুই শিক্ষকের মারামারিতে হতবাক পড়ুয়ারা]
হাসপাতালের পাশে তাঁর মতো অনেকেরই চায়ের দোকান আছে। শিশিরবাবুর ‘চা-সেলের’ কোনও জবাব নেই তাদের কাছে। ওই চা বিক্রেতারা হয়তো এখন থেকেই বুঝতে পারছেন চৈত্র মাসে তাদের মাছি তাড়াতে হবে। রোগী এবং তাদের পরিজনদের সামান্য গরম জল চাইলে যখন অন্য দোকানিরা ফিরিয়ে দেন সেখানে সবার জন্য তাঁর দোকানের দরজা খোলা। কেউ তাড়াহুড়োয় খালি হাতে দোকানে এলে তাদের শুকনো মুখে ফেরান না শিশিরবাবু।
[শর্তসাপেক্ষে স্বেচ্ছামৃত্যুর অধিকারকে স্বীকৃতি, ঐতিহাসিক রায় সুপ্রিম কোর্টের]
২ টাকার চা নিয়ে এখন থেকেই নবদ্বীপের পাড়ায় পাড়ায় আলোচনা। চায়ের সেলের গপ্পো ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে হাতে হাতে ঘুরছে। চৈত্র মাস থেকে ভিড় তাহলে দোকানে আছড়ে পড়বে। কীভাবে সামলাবেন? এখন থেকেই সব পরিকল্পনা তাঁর সারা। ছেলে সান্তয়ন আছেনই। বন্ধু বিধান ঘোষও ভিড় হলে এগিয়ে আসেন। আর এক বন্ধু সজল চক্রবর্তী জানিয়ে রেখেছেন বন্ধুর সঙ্গে এমন উদ্যোগে তিনিও আছেন। তৃপ্ত শিশির বন্দ্যোপাধ্যায় তাই বলে যান, ‘‘একসঙ্গে দশ হাজার লোক এলেও সামলে নেব। শুধু একটাই অনুরোধ, তাদের বলব চা বানানোর একটু সুযোগ দিন। সবাই পাবেন।’’
সেই ১৯৮২ সাল থেকে চা-বানানো তাঁর ধ্যানজ্ঞান। বাবা ছিলেন মুদি ব্যবসায়ী। কেন ব্রাহ্মণের ছেলে হয়ে এঁটো কাপ ধুতে হবে তার জন্য শিশিরের এই পেশাকে সমর্থন করেননি বাবা। তবে এই ব্যবসা করেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আর তৃপ্তি পেয়েছেন মেয়ের শ্বশুরবাড়ির একটি কথা শুনে। তারাও ফেসবুকের মাধ্যমে এই চা সেল জানতে পেরে শিশিরবাবুকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। নবদ্বীপের প্রতাপনগর বিবেকানন্দ লেনের এই বাসিন্দা জীবনকে খুব সামনে থেকে দেখেছেন। হাজার হাজার লোককে চা বিক্রির লাভের টাকায় যাত্রা দল আনেন। ক্ষতি হলেও ট্যুর ছাড়েন। বছর আটান্নর এই ব্যবসায়ীর একটাই রুটিন। ভোর সাড়ে পাঁচটায় দোকান খোলা। রাত সাড়ে দশটায় একটু শান্তি। তবে শিশিরের চায়ের যারা রোজকার খদ্দের তারা এখন থেকেউ উসখুশ করছেন। সুবল ঘোষ, কালুয়া হাড়ি, দিলীপ ভৌমিকরা এক বাক্যে বলছেন চৈতন্যভূম স্বার্থক এমন মানুষের জনমে। চা-প্রেমের কী মহিমা তাহলে!