গৌতম ব্রহ্ম: নেই, অথচ আছে! দস্তুরমতো জানান দিচ্ছে। যে অঙ্গ বাদ পড়েছে, তাতেই অসহ্য ব্যথা! ভূতুড়ে যন্ত্রণা ছাড়া কী? দুর্ঘটনা বা সেপটিক হয়ে অঙ্গহানির শিকার বহু মানুষ এহেন অদ্ভূতুড়ে কাণ্ডের ভুক্তভোগী। যাঁর কাঁধের নিচ থেকে হাত নেই, তাঁর সেই ‘অদৃশ্য’ হাতেরই কবজি-কনুই যন্ত্রণায় যেন ছিঁড়ে পড়ছে। আবার রেল দুর্ঘটনায় পা বাদ পড়া পায়ের হাঁটু-গোড়ালিতে ব্যথার চোটে কারও পাগল পাগল দশা। ব্যথা উপশমের ওষুধ-ইঞ্জেকশন কিংবা অন্য কোনও প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতিও স্বস্তি দিতে পারছে না। এবার তাঁদের যন্ত্রণা মুক্তির দিশা দিল শিয়ালদহ ইএসআইয়ের ‘পেন ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট।’ স্রেফ আয়নার সাহায্যে এমন এক রোগীকে সুস্থ করে জিতে নিল ভারতসেরার শিরোপাও।
[সম্পর্কের ঝামেলা মিটিয়ে নেওয়ার পরামর্শ আদালতের, ডিভোর্সেই অনড় মেয়র]
সেই রোগীর নাম রাজেন বেহেরা। কোন্নগরের বাসিন্দা বছর পঁয়তাল্লিশের রাজেনবাবু জুটমিলে কাজ করতেন। ডান হাত মেশিনে ঢুকে গিয়েছিল। প্রথমে ডাক্তারবাবুরা হাতটি বাঁচানোর চেষ্টা করলেও পরে ব্যথা কমানোর জন্য সেই অকেজো হাতটি বাদ যায়। রোগীর ইচ্ছাতেই বাদ দিয়ে দেওয়া হয় হাত। কেটে ফেলার আগেই অবশ্য অসাড় হয়ে যাওয়া হাতটিতে ব্যাখ্যাহীন যন্ত্রণার শুরু। চিকিৎসকেরা ভেবেছিলেন হাত বাদ গেলে সুরাহা হবে। কিন্তু হয়নি। কাঁধের কাছ থেকে কেটে ফেলা সেই হাতেই প্রবল যন্ত্রণা অনুভব করতে থাকেন রাজেনবাবু। এমনই যন্ত্রণা যে, খাওয়া-ঘুম শিকেয় ওঠে। “যে হাতটা নেই, তাতেই অসম্ভব ব্যথা! কত হাসপাতাল ঘুরেছি। কত ওষুধ খেয়েছি। কিছুতেই কিছু হয়নি।”-বলেন রাজেনবাবু। তাঁর কথায়, “দাড়ি কামাতে পারতাম না। গায়ে এক ফোঁটা জল পড়লে প্রাণ বেরিয়ে যেত। মনে হত, আত্মহত্যা করি।”
শেষ পর্যন্ত তাঁর শাপমুক্তি ঘটেছে আয়নার জাদুতে। রাজেনবাবুর চিকিৎসক তথা ‘ইনস্টিটিউট অফ পেন ম্যানেজমেন্ট’-এর কোর্স ডিরেক্টর ডাক্তার সুব্রত গোস্বামী জানালেন, “এই রোগের নাম ফ্যান্টম পেন। মানে, অশরীরী ব্যথা। যে অঙ্গের অস্তিত্ব নেই, সেখানেই তীব্র ব্যথা। তাই এমন নাম।” কী ভাবে তা কমানো হল?

চিকিৎসকরা বলছেন, থেরাপির পদ্ধতি খুব সহজ। বাড়িতে বসেও যে কেউ এই অনুশীলন করতে পারবেন। রোগীকে প্রথমে আয়নার মাধ্যমে অক্ষত অঙ্গটির প্রতিবিম্ব (মিরর ইমেজ) দেখানো হয়। যেমন রাজেনবাবুকে দেখানো হয়েছিল তাঁর টিকে থাকা বাঁ হাতের মিরর ইমেজ। অনুপস্থিত হাত নড়াচড়া করলে যে ব্যথা হয় না সেটি মস্তিষ্ককে অনুভব করানো হয়। বিশেষ এক ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা হয়, যন্ত্রণাবিদ্ধ অঙ্গটির আদতে কোনও অস্তিত্ব নেই। ধীরে ধীরে ব্রেন তা বুঝতে পারে। সেই সঙ্গে যন্ত্রণাও কমতে থাকে বলে সুব্রতবাবুদের দাবি। এই থেরাপি’র নাম মিরর থেরাপি। এ পর্যন্ত রাজেনবাবুর মতো প্রায় দশ জনকে এর সাহায্যে কার্যত নবজীবন দিয়েছেন সুব্রতবাবুরা। তাঁদের কৃতিত্ব সারা দেশের চিকিৎসকমহলে আলোড়ন ফেলেছে। জয়পুরের সর্বভারতীয় আসরে পেন ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে এইমস, পিজি (চণ্ডীগড়)-এর মতো হাসপাতালকে টপকে সেরার মুকুট জিতে নিয়েছে শিয়ালদহ ইএসআই। মিরর থেরাপির কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুব্রতবাবু জানাচ্ছেন, দেহের প্রতিটি অঙ্গকে সক্রিয় রাখার ভার মস্তিষ্কের এক-একটি অংশের। অঙ্গটি বাদ পড়লেও তার দায়িত্বপ্রাপ্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশটি কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে নিষ্ক্রিয় হয় না। মস্তিষ্কের ওই কোষগুলি ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গটিকে স্বাভাবিক রাখার জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালায়। যার প্রতিক্রিয়ায় অশরীরী ব্যথার জন্ম। ওষুধ, ফিজিক্যাল ট্রিটমেন্ট, নার্ভ ব্লক, নিউরোমডিউলেশন, সার্জারি, কিছুতেই ব্যাথা যায় না। যাবে কী করে? আসল রোগ তো মাথায়!
[বাংলা থেকেই শুরু ফেডারেল ফ্রন্টের যাত্রা, মমতাকে পাশে নিয়ে ঘোষণা চন্দ্রশেখর রাওয়ের]
এই সত্যিটা অনুধাবন করেই তামিলনাড়ুর নিউরোসায়েন্টিস্ট ভিএস রামচন্দ্রণ একটি ‘মিরর বক্স’ উদ্ভাবন করেন। তার সাহায্যেই মস্তিষ্কের ‘কাউন্সেলিং’ করাচ্ছেন সুব্রতবাবুরা। ভূতুড়ে যন্ত্রণার খপ্পর থেকে নিস্তার মিলছে রাজেনবাবুদের।