সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: তিনি আলাদিন৷ তিনি আন্দ্রে ইনিয়েস্তা৷ আশ্চর্য প্রদীপের সন্ধান দিতে পারতেন তিনিই৷ অন্তত বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের অরণ্যে যখন বলের অপেক্ষায় চাতক হতেন স্ট্রাইকাররা, তখন তিনিই হতেন স্বপ্নের কাণ্ডারি৷ জনা-তিনেক ফুটবলার তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়ে৷ ছটফটে পা প্রতি মুহূর্তে ধোঁকা দিচ্ছে বিপক্ষের চোখকে৷ এই মনে হচ্ছে তিনি নিজেই দৌড়বেন গোলের দিকে৷ কিংবা যখন মনে হবে একটা দূরপাল্লার শট স্রেফ সময়ের অপেক্ষা মাত্র, ঠিক তখনই সকলকে অবাক করে তিনি বলের গায়ে ঠিকানা লিখে দিতেন৷ বাকিটা ম্যাজিক৷ কখনও মেসির, কখনও ইসকোর৷ কিন্তু ফুটবল বিশ্বে কত গোলে যে লেখা আছে ইনিয়েস্তার নাম, তার ইয়ত্তা নেই৷ রাশিয়া বিশ্বকাপে স্পেন ছিটকে যাওয়ার পরই সেই আশ্চর্য প্রদীপ ঝোলায় তুলে রাখলেন ম্যাজিসিয়ান৷
[ ২০২২ বিশ্বকাপে কি খেলবেন মেসি-রোনাল্ডো? কী বলছেন দুই মহাতারকা? ]
সব বিদায় তো স্বপ্নমধুর হয় না৷ সব সমাপ্তি তো মনের মতো হয় না৷ ইনিয়েস্তারও হয়নি৷ সে কথাই জানালেন তিনি৷ কী হতে পারত! বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা স্বপ্ন দেখেছিলেন ম্যাজিক দেখাবেন ইনিয়েস্তা৷ স্পেনের হয়ে কম ফুল তো তিনি ফোটাননি৷ দেশের জন্য হোক কিংবা ক্লাবের জন্য৷ পাশে যে স্ট্রাইকারই থাকুক না কেন, গোলমুখ খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার৷ দেশের ফুটবল সভ্যতায় নদীর মতোই পলি জুগিয়েছেন ইনিয়েস্তা৷ ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে তাঁর অববাহিকা৷ যার উপর আবার পালটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে দেশ৷ ফুটবল টিম গেম বটে, তবে সময়ে সময়ে এভাবেই একক দক্ষতা হয়ে উঠেছে দেশের সমার্থক৷ ইনিয়েস্তা তাই অন্য এক ফুটবল সংস্কৃতি৷ যেখানে স্পেন বা বার্সার সমর্থকের বাস শুধু নয়৷ সারা পৃথিবীর ফুটবলপ্রেমীরাই বেড়াতে যেতে ভালবাসেন৷ কারণ এমন চোখের আরাম আর কোথায়! এমন মনের শান্তিই বা কে সহজে দিতে পারেন! যেমনটা তিনি দিতে পারতেন চোখ জুড়নো ছবির মতো ফুটবলে৷
[ শুধু মেসি-রোনাল্ডো নন, বিশ্বকাপ অধরা মাধুরী এই তারকাদের কাছেও ]
তবু সব সমাপ্তি স্বপ্নের মতো হয় না৷ রাশিয়ার কেছে হেরে যখন বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিচ্ছেন মায়েস্ত্রো, তখন বললেন এ কথাই৷ জীবনে এমন কালো দিন আর আসেনি৷ শেষ ম্যাচে দেশেকে না জেতাতে পারার আক্ষেপ তাঁর থাকবেই৷ আর তাই গভীরতম দুঃখের সঙ্গেই ম্যাচ শেষে ডাগ আউটের দিকে হেঁটে গেলেন তিনি৷ হয়তো শুরু থেকে নামলে খেলার ফল অন্য হতে পারত৷ হয়তো আর একটু আগে নামলে খেলার মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারতেন৷ কিন্তু এখন সে সবই অতীত৷ এখন তা নেহাতই চর্চার বিষয়৷ ফুটবল বিশ্ব জানে, শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন ইনিয়েস্তা৷ ইনিয়েস্তা নিজেও তা জানেন৷ সুতরাং ওই আশ্চর্য প্রদীপের মায়া যে আর দেখা যাবে না সেটাই বাস্তব৷ তা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই৷
[ VAR নতুন নয়, আটের দশকে শুধু বাঙালিরাই জানত এর প্রয়োগ! ]
অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানিয়েছেন স্পেনের কোচ৷ কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনেরও৷ তবে শেষ পর্যন্ত একটা কথাই বলা যায়, ধন্যবাদ ইনিয়েস্তা৷ ফুটবলকে তুমি যা দিয়ে গেলে তার পরিমাপ করা সাজে না৷ ফুটবল দেবতা সযত্নে তুলে রাখবে সে নিবেদন৷ তবু আক্ষেপ যেন যায় না৷ ফুটবল তো এগিয়ে যাবে নতুন তারকাদের কাঁধে ভর করে৷ কিন্তু সেই রাতের মায়া, সেই গ্যালারি ভরতি মানুষের আশা-প্রত্যাশায় তিরতির করে কেঁপে ওঠা, সেই গোলমুখে দৌড়, সেই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বাড়িয়ে দেওয়া ঠিকানা লেখা পাশ, আর শেষমেশ গোলে জড়িয়ে যাওয়া বল…সেই ম্যাজিক আর কোথায়! আর কি কখনও কবে, এমন সন্ধ্যা হবে? হয়তো নয়৷ হয়তো আর তাঁর পাস থেকে আর গোল করবেন না মেসি৷ হয়তো আর কিছুই হবে না আগের মতো৷ প্রজন্মের সন্ধিলগ্নের বিশ্বকাপ কেড়ে নিচ্ছে একের পর এক ম্যাজিক৷ কেড়ে নিস ম্যাজিসিয়ানকেও৷ তবু স্মৃতি তো সে কাড়তে না৷ সেখানেই চিরকাল থেকে যাবে সেই সব অবিশ্বাস্য মুহূর্তরা, জ্বলবে ইনিয়েস্তার আশ্চর্য প্রদীপ৷