রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়: আলোড়নের বিবিধ প্রকৃতিভেদ থাকে। সূক্ষ্ম। মাঝারি। গভীর। কোন ঘটনার আগমনী আগ্রহ-আবেগের ব্যারোমিটারে কত দূর পৌঁছেছে, আলোড়ন সৃষ্টি করেছে কতখানি, সঠিক খোঁজ দেয় পারিপার্শ্বিক। বাস-ট্রাম-ট্রেন। জনপথের জনজীবন। সাধারণ মানুষের দরবারে তার বিকিরণ। রোববারের ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা মহিলা বিশ্বকাপের ফাইনাল (Women’s World Cup Final 2025) নিঃসন্দেহে সে দিক থেকে তৃতীয় গোত্রীয়। ইতিমধ্যে গভীর আলোড়নের সরণিভুক্ত। আকাঙ্ক্ষার রোববার আসার অনেক, অনেক আগে থেকে।
শনিবার অফিস আসতে-আসতে মেট্রো সফরকারী দুই সুহৃদের কথোপকথনের নির্যাস যা ভাসা-ভাসা কানে এল, শুনলে ঝুলন গোস্বামী-মিতালি রাজদের ঠোঁটে নির্ঘাৎ হাসি ফুটত। এ দিনটাই তো দেখতে চেয়েছিলেন তাঁরা। এ দিনের বাসনাতেই তো তাঁদের দীর্ঘ সংগ্রাম-যাত্রা। ভারতবর্ষের মহিলা ক্রিকেটের সংস্কারক ও প্রবর্তক-দুই-ই ধরা হয় ঝুলন-মিতালিকে। দেশে মহিলা ক্রিকেট খায় না মাথায় দেয় যখন কেউ জানত না, সে সময় থেকে তাঁদের উইলো-ডিউস হাতে অবতরণ। এবং কালক্রমে মহিলা ক্রিকেট কাঠামোর খড়-বিচালি-মাটি সমস্ত বদলে তার বর্তমান আধুনিকীকরণ। ঝুলন গত রাতে ফোনে বলছিলেন যে, দেশের মাটিতে চলতি বিশ্বকাপে তাঁর পরম প্রাপ্তি দর্শক-আগ্রহ। অকাতর দর্শক-সংখ্যা। খেলার দিন জেমাইমা-স্মৃতির জার্সি পরে নির্দ্বিধায় অফিস যেতে আর পুরুষ সমর্থকের বাঁধছে না। সে আর বিন্দুমাত্র ‘কিন্তু-কিন্তু’ করছে না! অর্থাৎ, রোববার যে দল ফাইনাল জিতবে, তারা কাপ পাবে মাত্র। পঁচিশ বছর পর বিশ্ব মহিলা ক্রিকেটে নতুন বিশ্বজয়ী পাবে। কিন্তু ভারতের প্রকৃত ‘বিশ্বজয়’ ইতিমধ্যে সম্পন্ন। নিত্য অফিস-কাছারি, রোগ-ভোগ, মাছ-ভাত খাওয়া আম-জনতার পৃথিবীর দরজা যে হাট করে খুলে, সে পৃথিবীতে ঢুকে পড়া গিয়েছে। এত দিন পর, দেশে মহিলা ক্রিকেট চালুর বছর বাহান্ন পর!
‘দ্যাখ তো, সাউথ আফ্রিকা কোনটা বেটার করে? রান চেজ? নাকি ফার্স্ট ব্যাটিং?” ‘ঠাকুর, আর কিছু চাইব না। আজ শুধু হরমনপ্রীতকে টসটা জিতিয়ে দাও!’ ‘সাউথ আফ্রিকার প্লেয়ারটার নামটা কী যেন? আরে, সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যে সেঞ্চুরি করল। ইয়েস, লরা উলভার্ট। তবে মারিজেন ক্যাপও ভয়ঙ্কর। আগের দিন পাঁচটা উইকেট নিল কেমন, দেখলি?’ মারিজেন ক্যাপ। লরা উলভার্ট। আজ থেকে দশ বছর আগেও প্রাক মহিলা বিশ্বকাপ ফাইনাল লগ্নে, পুরুষ ক্রিকেট-মোহান্ধ দর্শক গড়গড়িয়ে মহিলা বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রতিপক্ষ প্লেয়ারের নাম মুখস্ত বলে যাচ্ছে, ভাবাই যেত না (উপরে যা লিখলাম, এ দিনের দুই মেট্রো সহযাত্রীর কথোপকথন)। জানি, কেউ কেউ বলবেন অতিরঞ্জিত। বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রিভিউয়ের নামে গল্পের গরু গাছে তোলার প্রয়াস চলছে।
বাস্তব হল, না। চলছে না। এ সমস্ত সত্যিই ঘটছে। আশপাশে তাকান। কান পাতুন। পাড়ার ঝন্টুর চায়ের দোকানে যান। বিল্টুর সিগারেটের দোকানে টু মারুন। সর্বত্র এক আলোচনা। সর্বত্র এক আকাশ প্রত্যাশা। আহা রে, লড়াই করে আমাদের মেয়েগুলো এত দূর এল। সেমিফাইনালে বাঘা অস্ট্রেলিয়াকে অমন ঘাড় ধরে হারাল। বাছারা ফাইনালে পারবে তো? উল্টোপাল্টা কিছু হয়ে যাবে না তো?
শঙ্কা প্রত্যাশিত। ২০১৭ ওয়ান ডে বিশ্বকাপেও ফাইনালে উঠেছিল ভারত। ঝুলনরা যা আজও ভুলতে পারেন না। মাত্র ৯ রানে সেই যুদ্ধ হেরে গিয়েছিল ভারত। সে সময় শ্রীলঙ্কায় সিরিজ কভার করতে গিয়েছিলাম। পেশাগত তাড়নায় লেখাপত্র গোটা কতক পাঠাতে হয়েছিল বটে। কিন্তু আজকের মতো প্রাক্ ফাইনাল গণ-উন্মাদনা কিংবা আশঙ্কা-দু’টোর একটাও আট বছর পূর্বে ছিল না। লোকে তো বলছে, রোববার জিতলে সেটা দেশের মহিলা ক্রিকেটের ‘এইট্টি থ্রি মোমেন্ট’ হয়ে যাবে! তিরাশিতে কপিল’স ডেভিলস বিশ্বজয়ী হওয়ার পর যেমন দেশের পুরুষ ক্রিকেটের ‘বিশ্বায়ন’ হয়েছিল। আজ হরমনরা জিতলে, ভারতের মহিলা ক্রিকেটের অবিকল তাই হবে!
দেখতে গেলে, অস্ট্রেলিয়া-সম ত্রাস না হলেও, দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট-পরাশক্তি। বছর চারেক আগে সে দেশে এক ক্রিকেট দর্শনের জন্ম হয়েছে। যার নাম- ‘আর্টিস্টিক হান্টার’! যে দর্শন বোঝায়, খেলায় ব্যাকফুটে থাকাকালীন কী করে ফ্রন্টফুটে ফিরতে হবে। আগ্রাসী ক্রিকেটের হাত ধরে। একটা পরিসংখ্যান দেখছিলাম, সে দর্শন আমদানির আগে পর্যন্ত নারী-পুরুষ মিলিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার আইসিসি ফাইনাল সংখ্যা ছিল মোটে দুই। ট্রফিসংখ্যা, এক। আর সে তত্ত্বের সঙ্গে ‘করমর্দনের’ পর বিগত দু’বছরে চারটে আইসিসি ট্রফি ফাইনাল খেলেছে তারা। চ্যাম্পিয়ন একটায়!
অগত্যা? অগত্যা, এ হেন ‘পুনর্জন্ম’ নেওয়া ক্রিকেট-শক্তির বিরুদ্ধে রোববার নামার সময় ভারতীয় ড্রেসিংরুমে এমন এক চরিত্র প্রয়োজন, যিনি ফাইনালের চাপে ভাঙলেও, মচকাবেন না। বরং ঠান্ডা মাথায় দু’টো মেসেজ দিয়ে, টিমকে হালকা করে দিতে পারবেন। যিনি ‘চক দে ইন্ডিয়া’-র কবীর খানের মতো উজ্জীবিত জয়মন্ত্র দিতে পারবেন টিমকে। স্মৃতি মান্ধানা-জেমাইমা রডরিগেজদের গমগমে গলায়, ‘ইয়ে সত্তর মিনিটের’ বদলে বলতে পারবেন, ‘ইয়ে আট ঘণ্টে…।’ নাহ্, হরমনপ্রীতদের কোচ অমল মুজুমদারের গলা গমগম করে না। কিন্তু উপরে যা যা লিখলাম, প্রত্যেকটা অনায়াসে করতে পারেন তিনি। ভারতবর্ষের ঘরোয়া ক্রিকেটের জাঁদরেল চরিত্র হলে কী হবে, কখনও দেশের হয়ে খেলেননি অমল। দেখতে গেলে, সেটাই এক স্বতন্ত্র তাড়না হতে পারে। অমলের ব্যক্তিগত তাড়না। রোববার যদি জেতেন জেমাইমারা, যদি দেশের সর্বপ্রথম মহিলা বিশ্বজয়ী অধিনায়কের নাম হয় হরমনপ্রীত কউর, একটা গল্প যে তিনিও নাতি-নাতনিদের বলতে পারবেন। অমল বলতে পারবেন যে, জীবনে ভারত না খেলেও বিশ্বজয়ী হয়েছি আমি! এমন মোক্ষম সুযোগ ছাড়ে কেউ? তা ছাড়া সেটা প্রয়োজনও। সেমিফাইনালে অলৌকিক অস্ট্রেলিয়া-বধ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন জেমাইমা-হরমনপ্রীতরা। অবাধ্য আবেগের দাপাদাপিতে। ফাইনালের আগে আবেগ নিয়ন্ত্রণ দরকার। কারণ, প্লেয়ারদের তন্ত্রীতে একবার ‘ফাইনাল’ শব্দটা প্রবেশ করে গেলে, সামলানো খুব মুশকিল। তবে লিখে দিতে পারি, ভারতের নতুন ‘কবীর খান’ তা নিশ্চিত দেখে নেবেন। আবেগ-দুশ্চিন্তায় লাগাম পরিয়ে টিমকে বুঝিয়ে দেবেন, ফাইনালে কী প্রত্যাশা করে নামা দরকার? সেমিফাইনালে যেমন টিমকে বলেছিলেন, যা করছো, করো। শুধু ফিনিশিংটা খেয়াল রেখো।
দিন, দিন। যা যা গুরুমন্ত্র দেওয়া যায়, আজ অমল দিন টিমকে। হরমনপ্রীত-স্মৃতি-রিচা-জেমাইমা, আজ নিজেদের শ্রেষ্ঠ খেলাটা বার করে আনুন নভি মুম্বইয়ে, আর এক দোসরার (ধোনির নেতৃত্বে ভারতের বিশ্বজয়ও এক দোসরায় ছিল, দোসরা এপ্রিলে) পূণ্যলগ্নে। কী জানেন, সূর্য ডুবলে, সূর্য উঠবে। কিন্তু জেমাইমাদের বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার সুযোগ আর আসবে কি না, কেউ জানে না। তাই ঘরে-ঘরে আজ বাজুক শাঁখ, দেশজুড়ে আজ উঠুক ডাক। কন্যা চল, কাপটা দে! পুনশ্চ: দেখুন দেখি, কথায়-কথায় একটা বড় বিষয় লেখা হল না। অথচ লেখা উচিত ছিল সর্বাগ্রে। আজ যদি ভারত বিশ্বকাপ জেতে, এক বিরল কৃতিত্বের অধিকারী হয়ে যাবেন শিলিগুড়ির রিচা ঘোষ। যিনি টিমের উইকেটকিপার-ব্যাটার। কেন? সহজ তো। রিচাই হবেন সর্বপ্রথম বাঙালি ক্রিকেটার, যিনি ক্রিকেটে বিশ্বজয়ী!