ইংল্যান্ড: ২৮৭ (রুট-৮০, বেয়ারস্টো-৭০, বোলিং-অশ্বিন ৪-৬২, সামি ৬৪-৩) ও ৯-১(অশ্বিন ১-৯)
ভারত প্রথম ইনিংস: ২৭৪ (কোহলি ১৪৯, শিখর ধাওয়ান ২৬, বোলিং- সাম কুরান ৪-৭৪, অ্যান্ডারসন ২-৪১)
গৌতম ভট্টাচার্য: মাইক গ্যাটিংকে করা সেই শতাব্দী সেরা ডেলিভারির চালচিত্র মনে করা যাক সামান্য বদল হল। ব্যাটসম্যান পরিবর্তন-আর কিছু নয়। শেন ওয়ার্ন একই বল করেছেন শচীন তেন্ডুলকরকে। কী হত? “কী আবার হত? শচীন সুইপ মারত। বাউন্ডারি।” এতটুকু ব্যস্ত না হয়ে রায় দিয়ে এসেছেন হরভজন সিং। টেস্ট ব্যাটসম্যানশিপে যা কিছু চূড়ান্ত, অকল্পনীয়, অনতিক্রম্য সীমান্ত, সব কিছুই ভাজ্জি খুঁজে পেয়েছেন শচীনের মধ্যে। আর সেই সর্দারও কিনা লক্ষ্মীবারের খেলা শেষে বয়ঃকনিষ্ঠের প্রতি অপরিসীম পেশাদারি শ্রদ্ধায় মাথা ঝোঁকাচ্ছেন। “না, আজকের পর মেনে নিতে হচ্ছে বিরাট একই মাপের। ওর আমলে যে এত ভাল বোলার নেই, তার দায় তো ওর নয়। বিরাট যা বোলিং আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেয়েছে, বারবার প্রচণ্ড চাপেও চুরমার করেছে,” ‘সংবাদ প্রতিদিন’-কে বললেন হরভজন। শুধু ভাজ্জি কেন, ইংল্যান্ডের বুকে বিরাট কোহলির অতীত ব্যর্থতার ধার চুকোনো ১৪৯ দেখে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের বিলেতের সাবেকি রাজবাড়িগুলো যেন পলকে ফুটে উঠল।
গাভাসকরের চুয়াত্তরের ম্যাঞ্চেস্টার সেঞ্চুরি।
গাভাসকরের ওভালের ২২১।
দ্রাবিড়ের ২০০২—র হেডিংলে সেঞ্চুরি।
[‘বন্ধুত্বের খাতিরে’ ইমরান খানের শপথগ্রহণে যাচ্ছেন কপিল দেব-সিধু]
কোহলির ইনিংসের মাঝে দু’টো স্লিপ ক্যাচের কাঁটা থেকে যাওয়ায় ত্রুটিহীন গাভাসকরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আনা যাচ্ছে না। কিন্তু ইংল্যান্ডের মাঠে ভারতীয় ব্যাটসম্যানের খেলা সর্বকালের সেরা ইনিংস বিচারে বিরাট অবিসংবাদী তিনে উঠে এলেন। শৃঙ্খলা, নিষ্ঠা এবং মনের জোরে মিলিত ভাবে কোথাও যেন সেই সিডনির ডাবল হান্ড্রেডের শচীন। যতই প্রলোভন থাক, প্রথম পঞ্চাশে ড্রাইভ মারব না। এই পর্যন্ত মিল। অমিলও আছে। সিডনি-এজবাস্টনে অমিলের মধ্যে ডনের দেশে বাকি ব্যাটসম্যানরা তুরীয় ফর্মে থাকায় শচীনের উপর আদৌ দলগত চাপ ছিল না। পুনরুদ্ধার করার ছিল স্রেফ ব্যক্তিগত অহংকে। লক্ষ্মীবারের বার্মিংহ্যামে বিরাটকে বইতে হল দলকে। সঙ্গে নিজের প্রাচীন দৈন্যদশাকে। গাভাসকরের ম্যাঞ্চেস্টার সেঞ্চুরি আজ চুয়াল্লিশ বছর পরেও কালোত্তীর্ণ। কারণ? ইনিংসের মাঝে তিন বার বৃষ্টি এসেছিল। সিরিজের প্লেয়িং কন্ডিশন অনুযায়ী, বোলার্স রান আপ ঢাকা দেওয়া ছিল, পিচ নয়। গাভাসকরের সেঞ্চুরির মর্মার্থ লুকিয়ে আছে সে দিন ভিজে উইকেটে ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ নেওয়ায়। কোহলির ইনিংসের মর্মার্থ লুকিয়ে আছে কিছু স্ট্যাটসে। তাঁর ১৪৯ রানের পর টিমের সর্বোচ্চ স্কোরার কিনা ২৬। টিমের দশ নম্বর ব্যাটসম্যান ইশান্ত শর্মা যখন ব্যাট করতে নেমেছেন, কোহলির রান ৬৭। কী দাঁড়াল? দাঁড়াল, নিজস্ব ৮২ রান তিনি বাড়িয়েছেন দশ আর এগারো নম্বর ব্যাটসম্যানকে সঙ্গে নিয়ে। ওই মেঘলা পরিবেশে যখন বল বাঁক খাচ্ছে, ইংরেজ পেসাররা ঝাঁপিয়ে পড়ছে উইকেট তুলতে, গোটা মাঠ মদত দিচ্ছে চিৎকার করে। সেই সময় টেলএন্ডারদের নিয়ে প্রথম ইনিংসের ঘাটতি কমাতে কমাতে যাওয়া। সমতল হয়েও দুঃসাধ্য পর্বতারোহ। কোহলি চার বছর আগের গোটা ইংল্যান্ড সফরে করেছিলেন ১৩৪। এ বার এক ইনিংসেই শুধু সেটা পেরিয়ে গেলেন না, আরও নিষ্ঠুর আরও ক্ষুধার্ত এককভাবে তাঁর রক্ত চাটতে আসা ইংরেজদের মধ্যে জাঁকিয়ে থেকে গেলেন। জেমস অ্যান্ডারসন যেমন। বডি ল্যাঙ্গোয়েজ দেখে মনে হচ্ছিল, এই একটা উইকেট পেলে তিনি গোটা মরশুমের রোজগার চ্যারিটিতে দান করে দিতে পারেন। ক্রিকেট প্রকৃতিগত ভাবে ফিজিক্যাল, বডি কনট্যাক্ট স্পোর্ট না হয়েও সময়-সময় তাই। কোহলির ১৪৯ তাই সন্দেহাতীত ভাবে কালোত্তীর্ণ হয়ে থাকবে। দেড়শো অনেক হয়। এমন টেস্ট ইনিংস পনেরো-কুড়ি বছরেও আসে না।
কমবয়সী ব্রিটিশরা টি-টোয়েন্টি বা ওয়ান ডে-র কাস্টমার। টেস্ট ক্রিকেট দেখতে আর উত্তেজনা বোধ করছে না। কিন্তু ভারতীয় মুখগুলো গেল কোথায়? সেই ভিড়টা? বছর চার-পাঁচ আগে এ মাঠেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফাইনালে যখন অ্যালিস্টার কুকের ইংল্যান্ড বনাম মহেন্দ্র বাবুর ভারত মুখোমুখি হয়েছিল, বোঝা যায়নি ফাইনাল বার্মিংহ্যামে হচ্ছে না মুম্বইয়ে? শুধু কালো কালো মাথা আর তেরঙ্গা। কোথায় হারিয়ে গেল সেই জনপদ? বিরাট কোহলি প্রথম বলটা খেলার জন্য যখন জেমস অ্যান্ডারসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, এমন চিৎকার শুরু হল যা টেস্ট ক্রিকেটে আজকাল শোনাই যায় না। মীরপুর মাঠে আজও বাংলাদেশ দর্শক প্রধান বিরোধী ব্যাটসম্যানের জন্য এই জাতীয় অভ্যর্থনা বরাদ্দ রাখে। কালেভদ্রে ইডেনও। কিন্তু ফুটবলে ভয়ঙ্কর আসক্ত হয়ে পড়া ব্রিটিশরা আবার কবে থেকে টেস্ট ক্রিকেটে এত অনুরাগ ফিরে পেল? এ তো অ্যাসেজ সিরিজও নয়! অথচ বার্মিংহ্যামে এরা ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের এমন ব্যারাকিং করছে, যেন বেলজিয়াম ফুটবল টিম খেলতে এসেছে।
এজবাস্টন প্রেসবক্স পাঁচ তলায়। সেখান থেকে নীচের গ্যালারিতে নেমে এলাম। দেখি বৃদ্ধরাও চেঁচাচ্ছেন, ‘কাম অন জিমি, কাম অন। গেট হিম।’ অ্যান্ডারসন হলেন ইংল্যান্ড ক্রিকেটের বহু বছরের জেমস বন্ড। আর টেস্টের আগে ৫৪০ উইকেটে দাঁড়িয়ে থাকা পেসারকে চলতি সিরিজে একটা লাইসেন্সই দেওয়া হয়েছে; যাও বাকিদের কথা ভাবতে হবে না। ধরে নাও ইন্ডিভিজুয়াল স্পোর্ট। জাস্ট ওই লোকটাকে মেরে এসো। রোমাঞ্চকর লাগছিল বিষ্যুদবার এজবাস্টন গ্যালারিতে বসে। কে বলে টেস্ট ক্রিকেট মৃতপ্রায়? এই তো যাবতীয় ঐতিহ্য সমেত তার সাবেকি ডাকের সাজ। দলগত কাঠামোর খাঁজে ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি-কী তীব্রতম যুদ্ধ!
[রুটকে আউট করে সেলিব্রেশনে বিশেষ বার্তা বিরাটের, ভাইরাল ভিডিও]
আজ অবশ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে শোনার তেমন কিছু ছিল না। দুই গ্ল্যাডিয়েটরের লড়াই এমন পর্যায় পৌঁছেছিল যে প্রত্যেকে শিরায় শিরায় অনুভব করছেন। টেস্ট ক্রিকেট বলেই সম্ভব যে, দলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাপিয়ে ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি সুপার-যুদ্ধ এমন সূর্যের আলোর মতো ছিটকে আসে। দু’বার কোহলির স্লিপ ক্যাচ পড়ল। একবার অ্যান্ডারসন। একবার স্টোকস। অ্যান্ডারসনের বলে সহজ, স্টোকসেরটা কঠিন। কিন্তু সাবেকি ডাকের সাজের মাহাত্ম্য তাতে ক্ষুণ্ণ হওয়ার উপায় নেই। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষ হওয়ার ঘণ্টা তিনেক বাদেও মনে হচ্ছে, অ্যান্ডারসন বনাম কোহলি নয়।এটা অ্যান্ডারসন+কোহলি=ক্রিকেটের অমৃতমন্থন। পুনশ্চ: টেস্টের যা অবস্থা পুরো পাঁচদিন চলবে বলে মনে হয় না। রবিচন্দ্রন অশ্বিন শেষ ওভারে কুককে তুলে নিয়ে প্রথম ইনিংসে ১৩ রানের মনঃস্তাত্বিক ঘাটতি ঘুচিয়ে দিয়েছেন। এখন ঠিক ৫০—৫০। কেউ এগিয়ে নেই। কিন্তু বাকি রয়েছে এ দেশে অশ্বিনের অ্যাকাউন্ট ক্লোজিং। মনে রাখতে হবে, ২০১৪—র ইংল্যান্ড সফর শুধু বিরাটের নিষ্ফলা যায়নি! টেস্টের কম্পাস প্রচণ্ড উত্তেজক বিন্দুতে- অশ্বিনের অফস্পিন মোচড় বনাম ইংরেজ ব্যাটিং।