আত্রেয় মজুমদার, এসেন (জার্মানি): একদিন আকাশের দিকে চাইতেই আকাশটা খুব চেনা লাগল! এ তো পশ্চিম ইউরোপের পরিচিত ধূসর আকাশ নয়, বরং স্বচ্ছ নীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে কিছু পেঁজা তুলোর মতোন মেঘ। মনে পড়ল পুজো আসছে। সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা বিষাদ গ্রাস করল। কারণ এবারেও পুজোতে ঘরে ফেরা হবে না। পরক্ষণে মনে পড়ল—এখন তো আমি দুর্গাপুজোর নাটকের রিহার্সালেই যাচ্ছি! কলকাতায় ফেরা না হলেও এসেন শহরে “আইসিসি এসেন”-এর উদ্যোগে এবারে দ্বিতীয়বারের জন্য আয়োজিত হতে চলেছে শারদীয় দুর্গোৎসব। পুজোর কটাদিন জার্মানির এই ছোট্ট শহর এসেন যেন হয়ে ওঠে এক টুকরো কলকাতা। পাত পেড়ে বাঙালি ভোজ, আড্ডা, ধুনুচি নাচ এবং অবশ্যই প্রতি সন্ধ্যায় চলে বিবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এসব ভাবতে ভাবতেই কখন দেখি নাটকের রিহার্সালে পৌঁছে গিয়েছি হাউমানপ্লাটজের মাঠে। সেখানে আমাদের নাটকের দল “E-সেন বংশীয়”র বাকিরা অপেক্ষারত। আবার একপাশে জোর কদমে চলছে নাটকের দলের খুদে সদস্যদের মহড়া। এই অনুষ্ঠান এবং তার প্রস্তুতির মধ্যে দিয়েই আমাদের নতুন প্রজন্মের দুর্গাপুজোকে এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে চিনে নেওয়ার পালা।

চলতি বছরের পুজোয় দু’দিন দুটো নাটক হতে চলেছে। একটা ছোটরা করবে “লক্ষ্মণের শক্তিশেল”। অন্যটি নতুন নাটক “পাঁচমিশালি”। এদিকে কিছুক্ষণ আগে শেষ হয়েছে পুজো শুরুর আগমনী গানের মহড়া। নাটকের রিহার্সাল শেষ হলে শুরু হবে পুজোর আয়োজনের জরুরি বৈঠক। সব মিলিয়ে এসেন শহরের বাঙালি তথা ভারতীয়দের মধ্যে এখন সাজো সাজো রব! কয়েকদিন পরেই শুরু হবে মাতৃশক্তির আরাধনা। যার অপরিহার্য অংশ বাংলা সংস্কৃতির উদযাপন। এসবের মধ্যে দিয়েই দূরে গিয়েও কাছে থাকা, কলকাতার দুর্গাপুজোকে ফিরে পাওয়ার প্রাণপন চেষ্টা। হ্যাঁ, এখানে ভিড় ঠেলে ঠাকুর দেখা নেই, নেই ভোর ৩টের সময়ে রোল-কাটলেটের প্রলোভন। কিন্তু যেটুকু রয়েছে তা খুব আন্তরিক, আপন।
পুজো প্রস্তুতি তথা নাটকের রিহার্সাল সেরে বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম, আগের সেই মন কেমনটা আর নেই। আমার এসেনের বৃহত্তর বাঙালি পরিবারের সঙ্গে কাটানো গত বছরের পুজোর কথা মনে পড়ছিল। আধুনিক বাঙালির এই হয়তো ভবিতব্য, কাজের সূত্রে আমরা পাড়ি দিয়েছি ভিন দেশে। সেখানেই নিজের মতোন করে তৈরি করে নিচ্ছি এক টুকরো ‘বঙ্গদেশ’। সকলে মিলে মেতে উঠছে বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোয়। আমরা যে রবীন্দ্রনাথের সন্তান–“দেশে দেশে মোর দেশ আছে, আমি/ সেই দেশ লব যুঝিয়া…।”